শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

‘স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া দেশ ও গণতন্ত্রের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়’

জেলা প্রতিনিধি, কক্সবাজার
প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৪০ পিএম

শেয়ার করুন:

‘স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া দেশ ও গণতন্ত্রের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়’
বক্তব্য দিচ্ছেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী। ছবি: ঢাকা মেইল

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেছেন, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হবে। স্বাধীন ও মুক্ত সাংবাদিকতা ছাড়া দেশ ও গণতন্ত্রের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রকে সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে কক্সবাজার প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক ইউনিয়ন কক্সবাজারের বার্ষিক সাধারণ সভায় প্রধান বক্তার বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন সাংবাদিক ইউনিয়ন কক্সবাজারের সভাপতি নুরুল ইসলাম হেলালী।

কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ‘সাংবাদিকদের নিরাপত্তার পাশাপাশি নিজেদের অস্তিত্ব ও পেশাগত অধিকার রক্ষায় সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু সাংবাদিকদের স্বার্থ নয়, এটি সাধারণ মানুষের জানার অধিকার রক্ষারও অংশ।’

তিনি বলেন, ‘অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সাংবাদিকরা এখন বেশি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন। তবে সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ এখনো শেষ হয়নি। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রাতিষ্ঠানিক চাপ ও পেশাগত অনিরাপত্তাসহ নানা কারণে অনেক সাংবাদিক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাংবাদিকদের ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ যেমন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করে, তেমনি অপসাংবাদিকতা ও পেশাগত দক্ষতার ঘাটতিও বড় সমস্যা। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও কখনো কখনো এমন চাপ তৈরি হয়, যা সাংবাদিকদের নৈতিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত করতে পারে। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তার পাশাপাশি ন্যায্য বেতন, কর্মপরিবেশ ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি।’

বিএফইউজে মহাসচিব বলেন, ‘অধিকাংশ গণমাধ্যম ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী সাংবাদিকদের বেতন দেয় না। অনেক প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকদের বেতন মালিকের গাড়িচালকের বেতনের চেয়েও কম। এ ধরনের বৈষম্য বন্ধ করতে হবে। সরকারকে আমরা বলেছি ‘নো ওয়েজবোর্ড, নো মিডিয়া’ নীতি কার্যকর করতে। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে গণমাধ্যমের ভেতরের অনেক নৈরাজ্য দূর করা সম্ভব হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাংবাদিকতা নিছক চাকরি নয়। দেশে গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার, সব ধর্ম-বর্ণ ও গোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা এবং বৈষম্য দূর করতে সাংবাদিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। গণমাধ্যম উচ্চকণ্ঠ না থাকলে সমাজে নানা ধরনের অপরাধ ও অনিয়ম ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়। সাংবাদিকতা স্বাধীন ও শক্তিশালী না হলে গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারও নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’

সরকারের উদ্দেশে কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ‘সরকারকে একমাত্র স্বাধীন সাংবাদিকতাই সত্য কথা বলতে পারে। অন্যরা অনেক সময় সরকারকে খুশি করার মতো গল্প শোনাবে। আমলাতন্ত্র কিংবা গোয়েন্দা সংস্থাও নানা কারণে সবসময় সরকারকে প্রকৃত সত্য জানাতে পারে না। তারা অনেক সময় সরকারকে প্রশংসার জগতে আবদ্ধ রাখে। স্বাধীন সাংবাদিকতা হচ্ছে এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যারা সরকারকে সত্য কথা বলার পাশাপাশি সরকারের কর্মকাণ্ড যাচাই করার সুযোগ তৈরি করে।’

তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকদের জাতির বিবেক বলা হয়। আর সেই বিবেকের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র যদি হয় কলম, তাহলে সেই কলম থামিয়ে দেওয়া মানে শুধু একজন সাংবাদিকের কণ্ঠ রোধ করা নয়; সত্য প্রকাশের পথও সংকুচিত করা। সাংবাদিকের ওপর আঘাত মানে জাতির বিবেকের ওপর আঘাত।’

কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ‘একজন সাংবাদিক যখন দুর্নীতি, অনিয়ম, সন্ত্রাস, অব্যবস্থাপনা কিংবা মানুষের ওপর অন্যায়ের ঘটনা তুলে ধরেন, তখন তিনি বৃহত্তর সামাজিক স্বার্থে কাজ করেন। কিন্তু সত্য প্রকাশের কারণে কোনো সাংবাদিক হামলা, হুমকি বা হয়রানির শিকার হলে তার প্রভাব শুধু ওই সাংবাদিকের ওপর পড়ে না; অন্য সাংবাদিকদের মধ্যেও ভয়ের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে এমন পরিবেশ তৈরি হতে পারে, যেখানে সত্য জানলেও অনেকে তা প্রকাশ করতে সাহস করবেন না।’

তিনি বলেন, ‘কলমকে থামানো যায়, সত্যকে নয়।’ সাংবাদিকের কলম ধ্বংসের অস্ত্র নয়; এটি মানুষের কথা বলার, সত্য তুলে ধরার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার মাধ্যম। এই কলম মানুষের কষ্টের কথা বলে, অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করে এবং মানবিক বাংলাদেশের কথা বলে। তাই সাংবাদিকের কলম থামানো যাবে না। এতে রাষ্ট্রই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

তিনি আরও বলেন,‘সাংবাদিকের কলমকে ভয় না পেয়ে তাকে লিখতে দেওয়া, ক্ষমতাবানদের প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া এবং তাদের প্রশ্নের জবাবদিহির আওতায় আনা রাষ্ট্রের জন্যই কল্যাণকর। একটি দেশের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার ন্যায়বোধ, মানবিকতা, জবাবদিহি ও সত্য বলার সাহসের মধ্যে নিহিত।’

কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ‘সাংবাদিকরা যদি নিরাপদে কাজ করতে না পারেন, সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন কিংবা প্রশ্ন করার কারণে হুমকি পান, তাহলে সমাজে ভয় ও নীরবতার সংস্কৃতি তৈরি হবে। আর জাতির বিবেক নীরব হয়ে গেলে অন্যায়কে অন্যায় বলার মানুষও কমে যাবে। তাই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।’

তিনি বলেন, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার সমাধান হতে হবে আইন ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। হামলা, ভয়ভীতি বা চাপ প্রয়োগ করে কোনো সমস্যার সমাধান করা যায় না।

সভায় আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন, কক্সবাজার প্রেস ক্লাবের সভাপতি মাহবুবর রহমান, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এসএম আমিনুল হক চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন বাহারি, সহসভাপতি কামাল হোসেন আজাদ, সাংবাদিক ইউনিয়ন কক্সবাজারের সহসভাপতি এমআর মাহবুব, সাধারণ সম্পাদক এস এম জাফর, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ আলম, কোষাধ্যক্ষ ইকরাম চৌধুরী টিপু, সাংগঠনিক সম্পাদক শাহেদ মিজান, প্রচার সম্পাদক বেদারুল আলম এবং কার্যনির্বাহী সদস্য শামসুল হক শারেক ও জসিম উদ্দিন ছিদ্দিকী।

প্রতিনিধি/এমআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর