শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

ভাড়াটিয়া যাচাইয়ে শিথিলতা, সুযোগ পাচ্ছে অপরাধীরা

আহমাদ সোহান সিরাজী, সাভার (ঢাকা)
প্রকাশিত: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১০:২৯ এএম

শেয়ার করুন:

ভাড়াটিয়া যাচাইয়ে শিথিলতা, সুযোগ পাচ্ছে অপরাধীরা

রাজধানীর উপকণ্ঠের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল সাভার-আশুলিয়ায় অপরাধের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাড়ির মালিকদের মাধ্যমে ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও নিবন্ধনের ব্যবস্থা চালু থাকলেও বাড়ির মালিকদের উদাসীনতা ও প্রশাসনের শিথিলতায় তা অনেকটাই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

ভাড়াটিয়ার তথ্য যাচাইয়ের জন্য নির্ধারিত ফরম পূরণ করে থানায় জমা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও অনেক বাড়ির মালিকই তা মানছেন না। কেউ নিয়মটি জানেন না, আবার কেউ জানলেও ফরম পূরণ ও জমা দেওয়ার ঝামেলা এড়িয়ে চলেন। ফলে কারা কোথা থেকে এসে এলাকায় বসবাস করছেন, তাদের পরিচয় ও পূর্বের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রশাসনের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার তৈরি হচ্ছে না। এই সুযোগে ভুয়া পরিচয়ে বাসা ভাড়া নিয়ে অপরাধীরা আস্তানা গড়ে তুলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় রাতভর অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত ১১ আগস্টের ওই অভিযানে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ভুয়া তথ্য দিয়ে বাসা ভাড়া নেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। এতে ভাড়াটিয়ার পরিচয় যাচাইয়ের দুর্বলতা নতুন করে আলোচনায় আসে।

এ ছাড়া গত ১৬ আগস্ট আশুলিয়ার বাসাইদ এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে তার পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। এর দুই দিন আগে জামগড়া এলাকা থেকেও অজ্ঞাতনামা এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে সাভার-আশুলিয়ায় এ ধরনের প্রায় ১৫টি অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। এসব মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করতে পুলিশকে নানা জটিলতার মুখে পড়তে হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভাড়াটিয়ার তথ্য সংরক্ষণের ফরম সম্পর্কে অনেক বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়ারই স্পষ্ট ধারণা নেই। আবার অনেকে বিষয়টি জানলেও ফরম পূরণ, যাচাই ও থানায় জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিষ্কার নির্দেশনা না থাকায় তা করেন না।

আশুলিয়ার দক্ষিণ গাজীরচটের আয়নাল মার্কেট এলাকার বাড়ির মালিক আবু সাঈদ বলেন, ‘২০২২ সালে ভাড়াটিয়াদের জন্য একটি ফরম পূরণ করে রেখেছিলাম। একবার সেটি থানায় জমাও নেওয়া হয়েছিল। এরপর আর কেউ ফরমটি নিতে বা জমা দিতে আসেনি। ফলে সেটি এখনো আমার কাছেই রয়েছে।’

সাভার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের জামসিং এলাকার বাড়ির মালিক মো. সোহেল রানা বলেন, বাড়ির নিরাপত্তার জন্য ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংরক্ষণের বিষয়টি তিনি জানেন এবং ফরম পূরণ করতেও আগ্রহী। তবে ফরম কোথায় পাওয়া যাবে, কীভাবে পূরণ করতে হবে কিংবা কার কাছে জমা দিতে হবে, এসব বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা জানেন না।

সাভার পৌর এলাকার জয়পাড়া মহল্লার ভাড়াটিয়া আব্দুল আলীম বলেন, প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি সাভারে পরিবার নিয়ে ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন। ভাড়াটিয়া হিসেবে কোনো ফরম পূরণ করতে হয়—এমন কথা কোনো বাড়ির মালিক তাকে কখনো জানাননি। তার ভাষ্য, ‘শুধু এনআইডি কার্ডের ফটোকপি দিলেই হয়, আর কিছু লাগে না।’

আইনজ্ঞ ও জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে অপরাধীকে আগেই শনাক্ত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়া—দুই পক্ষকেই সচেতন করার পাশাপাশি কার্যকর ও হালনাগাদ তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক রবিউল ইসলাম বলেন, ভাড়াটিয়ার পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা শুধু কাগজে-কলমে থাকলে এর সুফল পাওয়া যাবে না। অপরাধ প্রতিরোধে বাড়ির মালিকের পাশাপাশি প্রশাসনেরও দায়িত্ব রয়েছে। তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি সহজ ও কার্যকর করতে হবে এবং সংগৃহীত তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ ও যাচাই করা প্রয়োজন। তবে আইনের পাশাপাশি এ ক্ষেত্রে সচেতনতাই হতে পারে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু বলেন, সাভার ও আশুলিয়ায় বিভিন্ন বাসাবাড়িতে অতীতে ছাপা ফরম দেওয়া হলেও সেগুলো থানায় ঠিকমতো জমা হয়নি। পুলিশ বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না, অন্যদিকে বাড়ির মালিকেরাও ভাড়াটিয়ার তথ্য যাচাই করতে চান না। তাই এলাকার নিরাপত্তার স্বার্থে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে অপরাধ দমনে ভাড়াটিয়াসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ে পুলিশ কাজ করছে বলে জানিয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, ভুল বা ভুয়া তথ্য দিয়ে কেউ যাতে বাসাবাড়িতে আস্তানা গড়তে না পারে, সে বিষয়টি কঠোরভাবে দেখা হচ্ছে। সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাইসহ পুরো ঢাকা জেলায় বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়াদের তথ্যের একটি সমন্বিত ডাটাবেজ তৈরির কাজ করছে পুলিশ। শিগগিরই বিষয়টি সামনে আনা হবে। এ কাজে বাড়িওয়ালা ও স্থানীয়দের সহযোগিতাও চেয়েছেন তিনি।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর