শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

কুমিল্লায় বাবার ভিটায় ২০ বছর ধরে শিকলবন্দী মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আজাদ

সাকলাইন যোবায়ের, কুমিল্লা
প্রকাশিত: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪০ এএম

শেয়ার করুন:

কুমিল্লায় বাবার ভিটায় ২০ বছর ধরে শিকলবন্দী মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আজাদ
২০ বছর ধরে চার দেয়ালের মধ্যে পায়ে শিকল পরা অবস্থায় কাটছে আজাদ মিয়ার জীবন। ছবি: সংগৃহীত

একসময় প্রাণচঞ্চল ও হাসিখুশি ছিলেন আজাদ মিয়া (৪০)। কিন্তু জীবনের অর্ধেক সময়, অর্থাৎ ২০ বছর ধরে চার দেয়ালের মধ্যে পায়ে শিকল পরা অবস্থায় কাটছে তাঁর। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সাহেবাবাদ ইউনিয়নের টাটেরা গ্রামে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য মুছা মিয়ার ছোট ছেলে আজাদের জীবনের এমন করুণ চিত্র দেখা গেছে।

চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট আজাদ। ২০ বছর বয়স পর্যন্ত স্বাভাবিক জীবনযাপন করতেন তিনি। বর্তমানে একতলা টিনশেড ভবনের একটি স্যাঁতসেঁতে ঘরে তাঁকে পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। ঘরে নেই কোনো খাট, বিছানা বা বালিশ। মাথার চুল উশকোখুশকো, পরনেও পর্যাপ্ত পোশাক নেই। নাম জিজ্ঞেস করতেই মুখভরা হাসি দিয়ে নিজের নাম আজাদ ও বয়স ৪০ বছর বলে জানান তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আজাদের বয়স যখন ২০ বছর, তখন পারিবারিক একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাড়িতে কাজ করতে আসা আবদুল লতিফ নামের এক দিনমজুরের সঙ্গে তাঁর তর্কাতর্কি হয়। একপর্যায়ে আজাদ ওই দিনমজুরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেন। পরে ওই শ্রমিকের হাতে সংক্রমণ হলে তা কেটে ফেলতে হয়। এর দুই বছর পর বড় ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে পারিবারিক কলহের জেরে তাঁকে মারধর করেন আজাদ। এসব ঘটনার পর থেকেই পরিবার তাঁকে মানসিক ভারসাম্যহীন দাবি করে শিকলবন্দী করে রাখে।

তবে গ্রামের একাধিক বাসিন্দার দাবি, আজাদ মানসিকভাবে সুস্থ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক গ্রামবাসী বলেন, আজাদের বাবা সরকারি চাকরি করতেন এবং মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাঁদের অঢেল সম্পদ রয়েছে। আজাদ যদি সত্যিই মানসিকভাবে অসুস্থ হতেন, তাহলে পরিবারের পক্ষে ভালো চিকিৎসা করানো সম্ভব ছিল। তাঁকে পরিকল্পিতভাবে অসুস্থ সাজিয়ে রাখা হতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আজাদের বড় ভাই অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য আমজাদ হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তাঁর ভাই দুটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানোর পর নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁকে শিকলে বেঁধে রাখতে বাধ্য হয়েছেন। একসময় আজাদকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। চিকিৎসকেরা ভালো হওয়ার আশা ছেড়ে দেওয়ায় পরে আর চিকিৎসা করানো হয়নি। তবে সম্প্রতি কুমিল্লার একজন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞকে দেখানো হয়েছে। তিনি কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়েছেন এবং আগামী মাসে আবার যেতে বলেছেন।

সাহেবাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, বিষয়টি তিনি এইমাত্র জেনেছেন। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যকে নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে যাবেন। বিস্তারিত জেনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সহায়তায় আজাদকে শিকল থেকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করবেন।

ব্রাহ্মণপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফারুক হোসেন বলেন, ঘটনাটি শোনার পর বিষয়টি খতিয়ে দেখতে আজাদের বাড়িতে পুলিশ পাঠানো হবে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় আইনি ও সামাজিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে জানতে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুন্নী ইসলামের মুঠোফোনে কল ও খুদে বার্তা পাঠিয়ে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি।

প্রতিনিধি/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর