রংপুরে ইয়াবা সেবন দেখে ফেলায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় মুগ্ধ দাসকে গ্রেফতার করতে গেলে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যান। বাড়ি থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে শশ্মানে প্রবেশ করেন তিনি।
এসময় মুগ্ধ দাস শশ্মানের কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ দাসকে বলেন, ‘দাদা- আমাকে একটু পানি দাও, আমাকে একটু আশ্রয় দাও; আমি তো গণপতি স্যারসহ চারজনকে খুন করেছি। পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করতে আসছে।’ এভাবেই আশ্রয় প্রার্থনা করে আসামি মুগ্ধ দাস।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালে সম্মেলন কক্ষে মামলার তদন্ত কার্যক্রমের অগ্রগতি বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ।
তিনি জানান, লাশ উদ্ধারের পর বিভিন্ন আলামত ও তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে রোববার (২৩ আগস্ট) ভোরে পুলিশ যখন মুগ্ধ দাসের বাড়িতে অভিযানে যায়, তখন পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যান মুগ্ধ। পরে তাকে ধাওয়া করলে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে মাহিগঞ্জ-দখীগঞ্জ শ্মশানে ঢুকে পড়েন। ক্লান্ত মুগ্ধ শ্মশানের কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ দাসের কাছে ‘দাদা- আমাকে একটু পানি দাও, আমাকে একটু আশ্রয় দাও; আমি তো গণপতি স্যারসহ চারজনকে খুন করেছি। পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করতে আসছে।’ এভাবেই আশ্রয় প্রার্থনা করে আসামি মুগ্ধ দাস।
এ কথা শুনে বিদ্যুৎ দাস তাকে আশ্রয় দিতে অস্বীকৃতি জানান। এরই মধ্যে পুলিশ সেখানে গিয়ে হাজির হন এবং তাকে গ্রেফতার করে।
অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষকসহ পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন অভিযুক্ত দুই খুনি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। তারা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
একইভাবে এই হত্যা মামলায় সাক্ষী হিসেবে সীমান্ত ও বিদ্যুতের জবানবন্দি আদালতে রেকর্ড করা হয়।
এছাড়া গ্রেফতার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের ডোপ টেস্ট ও ডিএনএ করার প্রক্রিয়া চলমান। ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে নিশ্চিত করা হয় প্রেস ব্রিফিংয়ে।
পুলিশ জানায়, ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাস তাদের বন্ধু সীমান্ত দাসের বাড়িতে ৩টা ইয়াবা সেবন করে। পরে ওই রাতেই মোবাইল বন্ধক রেখে ইয়াবা ব্যবসায়ী শান্তর কাছে আরও কয়েকটি ইয়াবা নিয়ে দেবুর নির্মাণাধীন ভবন হয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে উঠে। দেবর বাড়ির ছাদ খোলামেলা হওয়ায় বাতাসের কারণে ইয়াবা সেবনে সমস্যা, অন্যদিকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদ হাফ ওয়াল থাকায় ইয়াবা সেবনে সুবিধা।
আগেও তারা সেই ছাদে বসে ইয়াবা সেবন করেছে। ইয়াবা সেবন করতে করতে ভোর হয়ে যায়। ভোরে গণপতি চক্রবর্তী ঘুম থেকে উঠে হাঁটাহাঁটির জন্য ছাদে গিয়ে দেখেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাস ইয়াবা সেবন করছে। এ নিয়ে তিনি তাদের ধমক দিয়ে চিৎকার করেন। ইয়াবা সেবনের বিষয়টি সমাজে জানাজানি হওয়ার ভয়ে দ্রুতই সিদ্ধান্ত নেয়- গণপতি চক্রবর্তীকে মেরে ফেলবে। সেই সিদ্ধান্ত থেকে গণপতি চক্রবর্তীর গলায় থাকা গামছা দিয়েই তাকে হত্যা করে। এসময় ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে।
ধস্তাধস্তির শব্দ পেয়ে ছাদে উঠেন গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামী। এসময় সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাস দুজনে প্রীতিলতা ও আগামীকে ধরে ফেলে এবং প্রীতিলতাকে গামছা পেচিয়ে হত্যা করে। পরে দড়ি গলায় পেচিয়ে আগামীকে হত্যা করে। এরপর লাশগুলো যাতে দেবুর ছাদ থেকে দেখা না যায়, এ জন্য প্রীতিলতা ও আগামী লাশ টেনে সিঁড়ির দিকে নিয়ে আসা হয়। এরই মধ্যে ওই বাড়ির ছোট ছেলে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের ঘুম ভেঙে যায়। এসময় সিদ্ধার্থকে দেখে প্রিয়ম বলেন, দাদা তুমি এখানে কেন? এ কথা বলার পরপরই তাকেও দুজনে ধরে হত্যা করে।
পরপর চারজনকে হত্যার পর তারা দুজনে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এ জন্য তারা দুজনে গোসল করে। পরে তারা তাদের কাছে থাকা একটি ইয়াবা সেবন করে। এসময় তারা খেজুর ও শশা খায়। পরে এই হত্যাকাণ্ডটি ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করতে ভাঙচুর চালায়। স্বর্ণের গহনা ও ১৫ হাজার টাকা পায় তারা। এসময় স্বর্ণ আসল না নকল সেটি পরীক্ষা করে দেখে তারা। এসব ঘটনার বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকা সন্দেহে ছাদ থেকে পাওয়া একটা প্লায়ার্স দিয়ে বৈদ্যুতিক লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়। পরে সুযোগ বুঝে দুপুরে ছাদ টপকে সেখান থেকে বেরিয়ে যায়।
গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের সাথে কোনো রকম যোগাযোগ করতে না পেরে তার শ্যালিকা পূজা চক্রবর্তী শনিবার রাত ৯টার দিকে বাসার সামনে আসেন। এসময় দরজায় তালাবদ্ধ এবং বাড়িতে অন্ধকার দেখতে পান। এরপরে প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় পুলিশে খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে পুলিশ এসে ফায়ার সার্ভিসের মাধ্যমে তালা ভেঙে বাড়িতে প্রবেশ করে। এসময় বাড়ির ছাদে গণপতি চক্রবর্তী, সিঁড়ির কাছে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং একটি কক্ষের ভেতর থেকে আয়ুস চক্রবর্তীর লাশ উদ্ধার করা হয়। এসময় বাড়ির বৈদ্যুতিক লাইন বিচ্ছিন্ন এবং বাড়ির জিনিসপত্র ছড়ানো ছিটানো ছিল।
রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী আদি রংপুর শহরের মানুষ নন। তবে তিনি রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর এলাকার মানুষ ছিলেন। তিনি গাইবান্ধা ও লালমনিরহাট হয়ে রংপুর জিলা স্কুল থেকে শিক্ষকতা থেকে অবসর গ্রহণ করেন। গণপতি চক্রবর্তী প্রায় ২০১০ সালের দিকে মাছুয়াপাড়ায় জমি কেনেন এবং বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন ২০২৩ সালের দিকে। দীর্ঘদিন বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকার পর সম্প্রতি নির্মাণাধীন বাড়িটির দ্বিতীয় তলায় স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুস চক্রবর্তীকে নিয়ে বসবাস শুরু করছিলেন। স্নাতকোত্তর পাস ছিলেন আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী। তার চাকরি ও বিয়ের আলোচনা চলছিল। বিয়ে ঠিকও হয়েছিল প্রাথমিক পর্যায়ে। আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়ম রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
প্রতিনিধি/এলএ




