প্রায় ১৫ বছর ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে জীবন কাটাচ্ছেন সালেহা বেগম নামে ৬০ বছর বয়সী এক নারী। অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে এক জরাজীর্ণ ঘরে কাটে তার দিন-রাত। নেই বিদ্যুৎ, নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগেও তাকে ঘরের বাইরে বের হতে দেখেননি স্থানীয়রা। এমনকি গোসল ও মলমূত্র ত্যাগের জন্যও তিনি বাইরে বের হন না। সন্তানদের সঙ্গেও কথা বলেন না, এমনকি নিয়মিত খাবার দিতে গেলেও মেয়েকে দেখা দেন না।
ঘটনাটি পটুয়াখালীর কলাপাড়া পৌর শহরের নাচনাপাড়া এলাকার। স্থানীয়দের কাছে সালেহার জীবন যেন এক রহস্য। দীর্ঘ দেড় দশকে তাকে স্বাভাবিকভাবে ঘরের বাইরে বের হতে দেখেননি কেউ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সালেহা বেগমের বসতঘরটি দীর্ঘদিন ধরেই বসবাসের অনুপযোগী। প্রায় এক দশক আগে ঘরটি একদিকে হেলে পড়ে। চারপাশে জমে থাকে নর্দমার দুর্গন্ধযুক্ত পানি। ঘরে নেই বিদ্যুৎ, নেই পর্যাপ্ত আলো-বাতাস। ছোট্ট ঘরটির ভেতরে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়ানোরও জায়গা নেই। ঝুঁকিপূর্ণ এই ঘরটি যেকোনো সময় ভেঙে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন প্রতিবেশীরা।
সালেহার মেয়ে লাকী বেগম জানান, একসময় বাবা-মা ও ভাই-বোনদের নিয়ে তাদের সুখের সংসার ছিল। ২০১০ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে বাবা আবুল কালাম মারা যাওয়ার পরই বদলে যেতে থাকেন তার মা। ধীরে ধীরে সবার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। এরপর থেকে আর স্বাভাবিক জীবনে ফেরেননি তিনি।
তিনি আরও বলেন, মায়ের চেহারা দেখেছি বাবা যখন ছিল তখন। বাবা মারা যাওয়ার পর আর মায়ের সঙ্গে কথা হয়নি, দেখাও হয়নি। তিনি মাকে চিকিৎসার আওতায় এনে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি নিরাপদ একটি ঘরের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।
প্রতিবেশী মনোয়ারা বেগম বলেন, সালেহা বেগমের স্বামী প্রায় ১৫ বছর আগে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রামে মারা যান। এরপর থেকে তিনি আর কারও সঙ্গে কথা বলেন না, আমাদেরও দেখা দেন না। ঘরের ভেতরে প্রচণ্ড মশা-মাছি ও পোকামাকড় রয়েছে, সাপও আছে। এমন পরিবেশে তিনি কীভাবে থাকেন, তা আমরা বুঝতে পারি না।
সালেহা বেগমের এমন আচরণের পেছনে মানসিক কোনো সমস্যা থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ছাড়া তার শারীরিক বা মানসিক অবস্থার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার পবি মালাকার বলেন, সালেহা বেগমকে উদ্ধার করে মানসিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তার প্রকৃত সমস্যা শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এরপর যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হলে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, সালেহা বেগম ও তার পরিবারের প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান বলেন, সালেহা বেগমকে উদ্ধার করে চিকিৎসার আওতায় এনে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ক্যান্সারে আক্রান্ত তার ছেলে এবং ঝুঁকিপূর্ণ ঘরটির বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিনিধি/টিবি




