নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে সহোদর কোটায় দুই শিক্ষার্থীকে ভর্তি করানোর অনিয়মের ঘটনায় এবার আরও দুই সহকারী শিক্ষকের নাম এসেছে। তারা হলেন বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবু বকর সিদ্দিক (লিটন) ও আব্দুল মালেক আকন্দ।
দুজনই দশম শ্রেণির শ্রেণিশিক্ষক হয়েও সপ্তম শ্রেণির ওই দুই শিক্ষার্থীকে সহোদর কোটায় ভর্তির প্রত্যয়নে স্বাক্ষর করেছেন। তবে তাদের দাবি, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শেখ মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদের চাপেই তারা ওই প্রত্যয়নে স্বাক্ষর করেন।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, সহোদর কোটায় ভর্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর ভাই বা বোন একই বিদ্যালয়ে পড়ছে কি না, তা যাচাই করে প্রত্যয়নে সংশ্লিষ্ট শ্রেণিশিক্ষকের স্বাক্ষর নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু সপ্তম শ্রেণির ওই দুই শিক্ষার্থীর প্রত্যয়নে স্বাক্ষর করেছেন দশম শ্রেণির দুই শ্রেণিশিক্ষক।
গত জুলাইয়ে বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে উপজেলা প্রশাসন তদন্ত শুরু করে। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এম এ কাদেরকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। গত সপ্তাহে তদন্ত প্রতিবেদন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া হয়।
বিদ্যালয় সূত্র জানায়, চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল উচ্চ আদালত দুই শিক্ষার্থীকে সহোদর কোটায় ভর্তির নির্দেশ দেন। পরে একই মাসে তাদের সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। তারা হলেন মোহনগঞ্জ পৌর শহরের টেংগাপাড়া এলাকার মাহমুদুল হাসান চৌধুরী মানিকের মেয়ে মাহফুজা হাসান এবং একই এলাকার মঞ্জুরুল হকের মেয়ে মারিয়া আক্তার মীম।

বিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মাহফুজা হাসান সপ্তম শ্রেণির প্রভাতী শিফটের ‘ক’ শাখায় এবং মারিয়া আক্তার মীম দিবা শিফটের ‘ক’ শাখায় ভর্তি হয়েছে। স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাহফুজা হাসানের কোনো ভাই বা বোন ওই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে না। অন্যদিকে মারিয়া আক্তার মীম তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান।
অভিযোগ রয়েছে, ওই দুই শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের সহোদর কোটায় ভর্তির জন্য ভুয়া প্রত্যয়ন দেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শেখ মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ। পরে সেই প্রত্যয়ন দিয়ে উচ্চ আদালতে রিট করা হলে আদালত তাদের ভর্তির নির্দেশ দেন।
ভুয়া প্রত্যয়নে স্বাক্ষরের বিষয়টি স্বীকার করে সহকারী শিক্ষক আবু বকর সিদ্দিক (লিটন) বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক স্বাক্ষর করতে বলেছেন, তাই করেছি। কোন শিক্ষার্থীর প্রত্যয়নে স্বাক্ষর করেছি, তা খেয়াল করিনি। মূলত প্রধান শিক্ষকের কথার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। সহোদর কোটার প্রত্যয়নে শ্রেণিশিক্ষকের স্বাক্ষর করতে হয়। যেহেতু আমি দশম শ্রেণির শ্রেণিশিক্ষক, তাই ওই প্রত্যয়নে আমার স্বাক্ষর করা ঠিক হয়নি।’

অপর শিক্ষক আব্দুল মালেক আকন্দও একই ধরনের বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক স্বাক্ষর করতে বললে তো আর মানা করা যায় না।’
বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেন, শুধু ওই দুই শিক্ষার্থী নয়, আরও অনেক শিক্ষার্থীকে এভাবে অনিয়ম করে ভর্তি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শেখ মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ। তিনি বলেন, ‘অভিভাবকেরা উচ্চ আদালতের আদেশ নিয়ে এসেছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সভাপতিত্বে ভর্তি কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের ভর্তি করা হয়েছে। আমি কোনো ভুয়া প্রত্যয়ন দিইনি। আদালত কীভাবে আদেশ দিয়েছেন, সেটিও আমার জানা নেই।’
মঙ্গলবার বিকেলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিদ্যালয়ের ভর্তি কমিটির সভাপতি আমেনা খাতুন বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে।’
এদিকে, গত মার্চে একই বিদ্যালয়ের সরঞ্জাম কেনাকাটায় প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগও ওঠে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শেখ মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদের বিরুদ্ধে। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
প্রতিনিধি/এসএস




