মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

সাকুয়া গ্রামের শতবর্ষী বাউল গফুর যেমন আছেন আধুনিক জামানায়

এম এ কালাম
প্রকাশিত: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৭ পিএম

শেয়ার করুন:

সাকুয়া গ্রামের শতবর্ষী বাউল গফুর যেমন আছেন আধুনিক জামানায়
শতবর্ষী বাউল আব্দুল গফুর

ময়মনসিংহ সাকুয়া গ্রামে জন্ম আমার, সত্য কথাটাই যে বলি।
তারুন্দিয়া ইউনিয়ন জুড়িয়া, ঈশ্বরগঞ্জে আমার ঘর,
পনেরো বছর বয়স থেকে গানের লাইগা হইলাম পর।
কলের মনের জোর তো আছে খাড়া, শইল্লে অহন জোর পাই না,
সুরের সাগরে ভাসতে চাই, কিন্তু আগের মতন ডাহে না।
বাউল গফুর নাম রাখিয়াছে, গাঁয়ের আবাল বৃদ্ধ সব,
ঘর-সংসার তো ভাইঙ্গা গেছে, থাহে শুধু গানের কলরব।
আর কয়ডা দিন আল্লাহ আমায় রাখত যদি বাঁচাইয়া,
মনের গান শুনাইয়া যাইতাম, আপন সুরে গাইয়া।’

ময়মনসিংহের শতবর্ষী বাউল আব্দুল গফুর। চুল দাড়ি হয়ে গেছে সাদা। পরনে পাঞ্জাবি লুঙ্গি, পায়ে স্যান্ডেল, হাতে লাঠি। গাছতলায় চেয়ারে বসে বাড়ি থেকে চিরচেনা সড়ক দেখছিলেন আনমনে। মোটরসাইকেলের শব্দে দৃষ্টি ঘোরানোর চেষ্টা করছিলেন, কিন্ত চোখের আলো এখন আগের মত কাজ করে না। কাছে গিয়ে কুশল বিনিময়ের পর আপ্যায়নের তোরজোর শুরু করলেন তখন দুপুর গড়িয়ে পশ্চিম আকাশে ভাদ্র মাসের সূর্য গড়িয়ে পড়েছে। আম গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে কপালে পড়ছে তীব্র রোদ।

একতারা হাতে গানে সুর তুললেন তিনি, ‘শোনেন ভাইরে দয়াময়, গানের সুরে জানাই আমার আসল পরিচয়। কছিম উদ্দিন পিতা আমার, দুনিয়া ছেড়ে গেছে চলি, জোছনা যেন ঢলে পড়ছিল সে রাতে।’

সম্প্রতি ময়নসিংহের বুড়া পীর শাহর মাজার প্রাঙ্গণে ‘পূর্ণিমা রাতে, পরমের সাথে’ অনুষ্ঠানে তিনি আলোচনায় আসেন। আয়োজক ময়মনসিংহ বাউল সমিতি। উদ্বোধন করতে লাঠিতে ভর দিয়ে কাঁপা কাঁপা পায়ে মঞ্চে উঠলেন তিনি। প্রথমে নিলেন সাঁইজির নাম। পরে একতারায় তুললেন গীতিকবি বাউল রশীদ উদ্দিনের লেখা গান— ‘চলো যাই শিকারে, বাঘিনীর ডাকে অন্তর কাঁপে, ঐ না মধুপুরের গড়ে।’ তার সঙ্গে গলা মেলাতে অসুবিধা হয়নি হাজারো শ্রোতার। গান শেষে করতালি যেন থামতেই চাইছিল না। কিন্তু থামতে চাইলেন গানওয়ালা। তবে দর্শকদের সমস্বরে চিৎকার— ‘ও গানওয়ালা, আরেকটা গান গাও।’ অনুরোধে ঢেঁকি গিলতে হলো তাকে। এবার ধরলেন ওস্তাদ উমেদ আলী ফকিরের লেখা— ‘আজব রঙের কল বসাইছে, মানুষের দেহায়।’ এবারও দর্শকশ্রোতা বিমোহিত। হবেই বা না কেন? তাদের সামনে যে গাইছেন শতবর্ষী এক বাউল। বয়সকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া এই বাউলের নাম আব্দুল গফুর।

জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার জন্ম ১৭ মার্চ ১৯১৭। সেই হিসাবে তার বয়স এখন ১০৯ বছর চলছে। এই বয়সেও গানে গানে আসর মাতাতে তার জুড়ি মেলা ভার। এই যেমন সেদিন (২৯ জুলাই) আষাঢ়ী পূর্ণিমায় মাতিয়েছিলেন বাউল আসর। আগে দূর-দূরান্তে চলে যেতেন। বয়সের ভারে এখন আর খুব একটা যেতে পারেন না। তবে ময়মনসিংহের কোথাও বাউলগানের আসর বসলে আব্দুল গফুরকে আটকানো কঠিন।

Gafur1

অভাবের চিহ্ন ঘরে

বাড়িতে আসছেন আমার ঘরটা একটু দেখে যান। পাশে দাঁড়ানো স্ত্রী রোকেয়ার একই আবদার। টিনসেডের একটি দুচালা ঘরে ছেলেমেয়ে নিয়ে বসবাস করে বাউল গফুর। চালের টিনগুলো ফুঁটো হয়ে গেছে সেই কবে। এখন একটু বৃষ্টি হলেই বসে থাকতে হয় বৃষ্টির পানি থেকে শরীর বাঁচাতে।
 
তাঁর ঘরটা দেখার পর আপনার মনে হবে হুমায়ূন আহমেদ বোধ হয় এটা দেখেই লিখেছিলেন, ‘আমার ভাঙা ঘরে ভাঙা চালা, ভাঙা বেড়ার ফাঁকে/অবাক জোছনা ঢুইকা পড়ে, হাত বাড়াইয়া ডাকে।’ ঘরে আসবাব বলতে দুটি খাট, একটি টেবিল আর একটি শেলফ। ছোট্র একটি আয়না তাও ভাঙ্গা। বাঁশের বেড়ায় তা ঝুঁলিয়ে রাখা হয়েছে। এখানেই স্ত্রী রোকেয়া বেগমকে নিয়ে থাকেন। দুই সন্তানের জনক তিনি। ছেলেরা গার্মেন্টসে কাজ করে।

দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম আব্দুল গফুরের। বাবা ছিলেন বর্গাচাষি। তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। অনটনের সংসার। স্কুলের গণ্ডিতে পা রাখার সৌভাগ্য হয়নি। কিশোর গফুর বাবার সঙ্গে মাঠে কাজে যেতেন। বিভিন্ন সময়ে অন্যের জমিতেও মজুরি দিতেন। এলাকায় তখন নানা উপলক্ষে পালাগানের আসর বসত। বাবার হাত ধরে সেখানে হাজির হতেন গফুর।

বাড়ি থেকে অদূরে কিজাব উদ্দিন নামে এক পালাকার ছিলেন। তার কাছে তালিম নিতেন গফুর। একবার সিলেট থেকে এলেন তাহের নামের এক গায়ক। তার সঙ্গে কিশোর গফুর চলে গিয়েছিলেন টাঙ্গাইলের মধুপুর পর্যন্ত। তখন তার বয়স মাত্র ১৫ বছর। গানের প্রতি এমন টান দেখে পরে কিজাব উদ্দিন গফুরকে নিয়ে গেলেন ওস্তাদ উমেদ আলী ফকিরের কাছে। এখানে এসে যেন সত্যিকারের দিশা পেলেন। উমেদ আলীর সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে থাকলেন। গুরুর সঙ্গে নানা জায়গায় গাইতেন। পরে নিজেই মাতিয়েছেন মঞ্চ। 

সাকুয়ার বাজারে তখন হালখাতা বা পুণ্যাহ অনুষ্ঠানে ডাক পড়তো বাউল গফুরের। বাউলগানের পাশাপাশি একসময় কবিগানও গেয়েছেন। এভাবে ধীরে ধীরে আব্দুল গফুরের নামডাক ছড়ায়। বিভিন্ন জায়গা থেকে আমন্ত্রণ আসতে থাকে। গাইতে এসেছিলেন রাজধানী ঢাকায়ও। গুরুর লেখা গানের পাশাপাশি তিনি ওস্তাদ রশীদ উদ্দিন, বাউল উকিল মুন্সী, জালাল খাঁসহ অনেকের রচিত গান গাইতে থাকেন। একসময় নিজেও রচনা করেন। এভাবে শতাধিক গান রচনা করেছেন বলে জানালেন। কোনোটিই লিপিবদ্ধ হয়নি। তবে তার স্মৃতিতে এখনও সতেজ গানগুলো। যখন-তখন ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষায় গাইতে পারেন।

Gafur3

আব্দুল গফুরের পাঁচটি গান

১. কী রে মন কলের ঢেঁকি, কেন বারা ভানলে না। সারাদিন বারা বানলে তুই, তুষ বিনে চাল দেখি না

২. আজব রঙের কল বসাইছে মানুষের দেহায়

৩. জাতি জ্যোতি ফুল মালতি তুলবে যদি আয়রে আয়, এই দেহের বাগিচায়

৪. আয় না সাধের এই দেহ ফিল্ডে, আয় না সাধের বল খেলায়

৫. এই বিশ্বহাটে ১৪তলায় জুড়ছে পাগলের মেলা

Gafur

তার প্রশংসা করেছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান

দীর্ঘ জীবনে বহুবার মঞ্চে উঠেছেন। ঝুলিতে জমা হয়েছে অনেক স্মৃতি। ১৯৭৯ সালের দিকে একবার ময়মনসিংহের গৌরীপুরে খাল খনন উদ্বোধন করতে গিয়েছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। গৌরীপুরের রেলস্টেশনের কাছে জনসভা। সেখানে গাওয়ার পর জিয়াউর রহমান তার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছিলেন, ‘গান চালিয়ে যান।’

নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের অনেকেই তার গান গেয়ে থাকেন। অনেকে হয়তো জানেনও না গানগুলো তার লেখা। গাওয়ার সময় অনেকেই গানের শেষে থাকা রচয়িতার নাম বাদ দিয়ে গেয়ে থাকেন, যা তাকে ভীষণ কষ্ট দেয়। একসময় তার কাছে গানের অনেক সরঞ্জাম ছিল। বিভিন্ন সময়ে এগুলো অনেকে নিয়ে গেছে। একবার আগুন লেগে অনেক কিছু পুড়ে গেছে। অনেকে নিয়েও গেছে।

‘আমার অহন তো কিছু নাই। সব যন্ত্রপাতি নিচে গা। কেউ নিচে বাড়িত সাজাইয়া রাখত, আর কেউ নিচে স্মৃতি রাখত। আমি গাইতাম চাই। আর কয়ডা দিন আল্লাহ যেন বাঁচাইয়া রাখেন, যাতে গানগুলা রেকর্ড থাহে।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন প্রবীণ এই শিল্পী।

Gafur2

৩০ থেকে ৩৫ জন শিষ্য

একসময় গান শেখাতেন। অনেকেই বাড়িতে আসতো। অনেকে আবার বাড়িতে থেকে গান শিখতো। এর মধ্যে মারাও গেছেন বেশ কয়েকজন শিষ্য। যারা জীবিত আছেন তারা গান ছেড়ে দিলেও আমাকে এখনো ছাড়তে পারেন নাই বলে সাদা গোফের ফাঁকে মুচকি হাসলেন।

তার গান সংরক্ষণ প্রয়োজন

২০২০ সালে ময়মনসিংহ জেলা শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা জানিয়েছিল আব্দুল গফুরকে। এখন তিনি চান কোনো গবেষক যেন তার গানগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। আর চান নিজের একটি নতুন আশ্রয়। তিনি বলেন, ‘ঘরটা মেরামত করার অবস্থায় নাই। বৃষ্টি এলে বসে থাকতে হয়। নতুন একটা ঘর পাওয়া গেলে ভালো হতো।’

ময়মনসিংহ বাউল সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম আসলাম বলেন, ‘বাউল গফুর ময়মনসিংহের অহংকার। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে সম্মাননা জানানো দরকার। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে উদ্যোগ নিলে তার রচিত গানগুলো পাণ্ডুলিপি আকারে সংরক্ষণ করে রাখা যাবে।

প্রতিনিধি/এফএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর