মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

অবৈধ ড্রেজারে সয়লাব ব্রাহ্মণপাড়া  ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ফসলি জমি

জেলা প্রতিনিধি, কুমিল্লা
প্রকাশিত: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩৬ এএম

শেয়ার করুন:

অবৈধ ড্রেজারে সয়লাব ব্রাহ্মণপাড়া  ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ফসলি জমি

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় মাটিখেকো অবৈধ ড্রেজার ব্যবসায়ী ও ভূমি কর্মকর্তাদের সমঝোতায় বিলীন হচ্ছে তিন ফসলি কৃষি জমি। ভরাট হচ্ছে পুকুর, জলাশয় ও ডোবা।অভিযোগ রয়েছে উপজেলাজুড়ে অর্ধশতাধিক ড্রেজার চলছে দাপটের সঙ্গে। এসবের অন্তরালে রয়েছে উপজেলা ও স্থানীয় ভূমি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশ এবং কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য। সংবাদ প্রকাশের পর পূর্বপরিকল্পিত ভাবেই কয়েক ফুট পাইপ ধ্বংস করেই লোক দেখানো ও দায়সারা অভিযানে সীমাবদ্ধ ভূমি কর্মকর্তাদের কার্যক্রম।

মাটি খেকো ড্রেজার ব্যবসায়ীদের অনেকই দাবি করেন, স্থানীয় কতিপয় সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ম্যানেজ করে  চলছে অবৈধ ড্রেজারে মাটি ব্যবসা। কতিপয় ড্রেজার ব্যবসায়ীদের বরাত দিয়ে জানা যায়, ড্রেজার প্রতি মাসিক ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয় ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের। প্রভাবশালী ড্রেজার ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের অনেকেরই আবার রয়েছে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিক ও ভুক্তভোগী কৃষকরা অভিযোগ করেও পাচ্ছেন না এর প্রতিকার। উল্টো হুমকি-ধামকি ও হয়রানির ভয়ে প্রতিবাদ করতে সাহস পান না সাধারণ কৃষকরা। অবৈধ ড্রেজারে মাটি উত্তোলনে কঠোর আইন ও নিষেধাজ্ঞা থাকলেও আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দেদারসে চলছে অবৈধ ড্রেজারে মাটির ব্যবসা।

সরেজমিন দেখা যায়, ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে অর্ধশতাধিক অবৈধ ড্রেজার মেশিন চলছে নির্বিঘ্নে। এতে করে বিলীনের পথে একরের পর একর কৃষি জমি। ভরাট হচ্ছে পুকুর, জলাশয় ও ডোবা।  ফসলি জমির মালিকদের একপ্রকার জিম্মি করেই চলছে অবৈধ এই মাটি খননকারী দানব যন্ত্রগুলো ৷ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের উত্তর চান্দলা, বলাকিয়া, বাড়ানী, জামতলী, ভাংগাব্রিজ, দধিখলা,কান্দুঘর, নোনাডী, মাধবপুর, চান্দলা ইউনিয়ন বড়ধুশিয়াসহ আরও প্রায় বিভিন্ন এলাকায় ২৫টি ড্রেজার মেশিন চলছে। 

ভাংগাব্রিজ এলাকার ড্রেজার ব্যবসায়ী মানিক মিয়া জানান, এলাকার প্রয়োজনে মাটি কাটি। সবাইকে ম্যনেজ করেই করতে হয় ব্যবসা। এতে করে পাশের জমির মালিকদের বুঝিয়ে বা টাকা একটু বেশি দিয়ে জমি কিনে নেই। জমি ভাঙা শুরু হলে সবাই মানে। চান্দলা ইউনিয়নের বড়ধুশিয়া, সবুজপাড়া, খলিফাপাড়া, দধিখলা, চরের ফাতরসহ বিভিন্ন এলাকা। শিদলাই ইউনিয়নের গোলাবাড়িয়া, বেড়াখলা, পূর্ব পোমকারা, দিঘীরপার, লাড়ুচো, শিদলাই ৭ নং,৮ নং ৯ নং ওয়ার্ড এলাকায়ও চলছে অবৈধ ড্রেজারের দৌরাত্ম্য। 

শশীদল ইউনিয়নের নাগাইশ এলাকায় নানান অজুহাতে ঘুঙ্গুর নদী থেকে একাধিক অবৈধ ড্রেজার দিয়ে চলছে অবিরাম মাটি উত্তোলন। এ ছাড়া নাগাইশ, হরিমঙ্গল, সাজঘর, চৌব্বাস, দেউসেও চলছে অবৈধ ড্রেজার। সাহেবাবাদ ইউনিয়নের সাহেবাবাদ, জিরুইন, টাকই, ছাতিয়ানিত। মালাপাড়া ইউনিয়নের কালাপানির জলার কৃষিজমি অধিকাংশই বিলীনের পথে। একস্থানে চলছে তিন চারটি ড্রেজার।

এ ছাড়া পূর্ব চন্ডিপুর, রামনগর,  দুলালপুর ইউনিয়ন এবং সদর ইউনিয়নেও চলছে একাধিক অবৈধ ড্রেজার। অবৈধভাবে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে পুকুর, জলাশয়, ডোবা ও নালার জমি ভরাট করে তৈরি হচ্ছে ভিটি। নাম প্রকাশ নানা করার শর্তে ভুক্তভোগী কৃষক ও সচেতন নাগরিকদের অনেকেই বলেন, ড্রেজার মালিদের কাছে আমরা জিম্মি। তারা প্রথমে ছোট জমিতে ড্রেজার বসায় পাশের জমি ভেঙে পরলে বাধ্য হয়ে তাদের কাছে বিক্রি করতে হয় কম দামে। প্রশাসন, সাংবাদিক ও ভূমি অফিসের সবাইকে ম্যানেজ করে ড্রেজার চালায় মাটি খেকো সিন্ডিকেট ৷ স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং অবৈধ ব্যবসার টাকা ও ক্ষমতার জোরে ভুক্তভোগীরাও যেন অসহায়। ভূমি অফিসে অভিযোগ করতে গেলে তাদের কাছে আগেই খবর চলে আসে। অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয় না।

উপজেলার প্রভাবশালী এসব ড্রেজার মালিকদের মাঝে রয়েছে দক্ষিণ নাইঘর এলাকার ময়নাল হোসেন, ধনু মেম্বার, গোলাবাড়িয়ার টিটু, জুজু মিয়া, মামুন, পোমকারার শাহিন, টাটাব্রিজের মাহবুব, টানব্রিজের সেলিম, শিদলাইয়ের জুলহাস, বড়ধুশিয়ার জাহাঙ্গীর, আলমগীর, জুম্মন, জসিম, ধানদৌলের জাকির, কাদের, নাগাইশের জালাল, রফিক, আরিফ, জুজু মিয়া, বাড়ানীর কামাল, মানিক, শিশন, সুমন, দধীখলার জব্বার, মকবুল ভান্ডারী, সুমন, চালনার শাহিন খান, টাটেরার তাজু, ছাতিয়ানীর তসলিমসহ আরও অনেকেই।

উপজেলা জুড়ে মাটিখেকো ড্রেজার সিন্ডিকেটের সবার সঙ্গেই রয়েছে ভূমি কর্মকর্তাদের নিবিড় যোগাযোগ। প্রতিমাসেই কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যে নির্বিঘ্নে চলছে অবৈধ এসব ড্রেজারে বালু ও মাটি কাটার ব্যবসা। ফলে মাঝে মাঝে ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলেও লোকদেখানো অভিযানে কিছু সংখ্যক পাইপ ধ্বংস করা হয়। কাজের কাজ কিছুই না, এমনই অভিযোগ ভুক্তভোগী মহলের। ফলে অভিযানের পরপরই আবার নতুন উদ্যমে শুরু হয় মাটি কাটা ও বালু উত্তোলন। 

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুন্নী ইসলাম বলেন, কৃষি জমিতে ড্রেজার কোনোভাবেই চলতে পারে না। তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অতি শীঘ্রই এসব অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হবে।

প্রতিনিধি/এফএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর