রোববার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে হত্যা

প্রমাণ মুছতে ডিটারজেন্টের পানিতে মোবাইল ভিজিয়ে রাখে দুই ‘খুনি’

জেলা প্রতিনিধি, রংপুর
প্রকাশিত: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০৮ পিএম

শেয়ার করুন:

রংপুরে ৪ খুন: প্রমাণ মুছতে ডিটারজেন্টের পানিতে ভিজিয়ে রাখে মোবাইল
নিহতের স্বজনদের আহাজারি ও পুলিশ পাহারায় দুই আসামি। ছবি: ঢাকা মেইল

রংপুরে দুই সন্তানসহ দম্পতিকে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে পুলিশ। ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় একই পরিবারের চারজনকে হত্যার পরও দুই ‘খুনি’ রাতভর ওই বাড়িতেই অবস্থান করে বলে জানিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীটি। হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ মুছে ফেলতে বাড়িতে ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট পাউডার মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখেন তারা। পরে শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তা ফাঁকা থাকার সুযোগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। 

রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। 

এর আগে ভোরে নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ নামে দুই যুবককে আটক করা হয়। তারা সম্পর্কে মামাতো ও খালাতো ভাই। 

পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে বসে ইয়াবা সেবন করছিলেন। এ সময় গণপতি চক্রবর্তী দেখে ফেলেন। বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তারা ওই শিক্ষককে গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করে। গোঙানির শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করলে সিঁড়ির কাছে তাকেও গলায় রশি পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। মাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থীকেও হত্যা করে তারা। 

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারের ছোট ছেলে ১২ বছর বয়সী আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়ম অভিযুক্ত দুজনকে আগে থেকেই চিনত। হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাকেও প্রথমে রশি পেঁচিয়ে এবং পরে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। 

চারজনকে হত্যার পরও বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাননি দুই খুনি। তারা নিজেদের শরীরের উত্তেজনা কমাতে গোসল করেন। পরে ডাইনিং টেবিলে বসে শশা ও খেজুর খাওয়ার পাশাপাশি সঙ্গে থাকা ইয়াবা সেবন করেন। 

পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে বাড়ির আসবাবপত্র ও বিভিন্ন জিনিসপত্র তছনছ করে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখেন তারা। স্বর্ণের গয়না আসল না নকল, তা যাচাই করতে আগুন দিয়ে পরীক্ষাও করেন অভিযুক্ত দুজন। 

এরপর বাড়িতে ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট পাউডার মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখে। পুলিশের ধারণা, মোবাইলে থাকা সম্ভাব্য আঙুলের ছাপ বা অন্যান্য আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যেই এমনটি করে। রাতের বাকি সময়ও তারা ওই বাড়িতেই অবস্থান করেন। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় কেউ দেখে ফেলতে পারে— এমন আশঙ্কায় সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন তারা। পরে শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকার সুযোগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। 

এ ঘটনায় শনিবার রাতে পুলিশ তালাবদ্ধ ওই বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থী ও ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করে। পুলিশ জানায়, বাড়ির বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। বিভিন্ন আসবাবপত্র ও জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। পরে ইয়াবা সেবনের আলামতসহ পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করে তদন্ত শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। একপর্যায়ে অভিযান চালিয়ে মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে আটক করা হয়। 

সিদ্ধার্থ একটি স্বর্ণের দোকানে এবং মুগ্ধ একটি মাছের দোকানে কাজ করতেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। 

নিহত গণপতি চক্রবর্তী চলতি বছরের ২ জানুয়ারি রংপুর জিলা স্কুল থেকে শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর নেন। পরে নগরীর সমবায় মার্কেটে একটি হোমিওপ্যাথি চেম্বারে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিতেন। তার মেয়ে আগামী চক্রবর্তী রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে মাস্টার্স পাস করেছেন। ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

প্রতিনিধি/এলএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর