দিনের আলোয় যে সৈকত পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকে, রাত নামলেই সেই সৈকতের বুকেই বসে বালু তোলার যন্ত্র। ড্রেজার ও পাইপলাইনের মাধ্যমে গোপনে সমুদ্রতল ও বালিয়াড়ি থেকে তুলে নেওয়া হচ্ছে বালু। এতে সৈকতের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হচ্ছে বড় বড় গর্ত ও চোরাবালির মতো ঝুঁকিপূর্ণ স্থান। পর্যটকদের জন্য এসব স্থান পরিণত হচ্ছে সম্ভাব্য মৃত্যুফাঁদে।
পরিবেশবাদীদের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ বছরে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের গুপ্তখাল ও চোরাবালিতে পড়ে অন্তত ১৩১ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। তাদের অভিযোগ, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন এবং সৈকত রক্ষায় নির্মিত জিওব্যাগের বাঁধের নানা অনিয়মের কারণে নতুন করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান তৈরি হচ্ছে।
সর্বশেষ গত ৭ আগস্ট রাতে কলাতলী পয়েন্টের ভাঙ্গার মোড়সংলগ্ন সৈকতে পাইপলাইন ও বিশেষ মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলনের ঘটনা ধরা পড়ে। খবর পেয়ে রাত ১টার দিকে জেলা প্রশাসনের পর্যটন শাখার একটি দল সেখানে অভিযান চালায়। তবে প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেয়ে জড়িতরা পালিয়ে যায়। পরে ঘটনাস্থল থেকে বালু উত্তোলনের মেশিন, বড় পাইপ ও জিওব্যাগ জব্দ করা হয়।
পর্যটন শাখার ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান সায়েম জানান, জব্দ করা আলামতের ভিত্তিতে এ ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সৈকতে নজরদারির জন্য তিনজন সৈকতকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।
সৈকতের ভাঙন ঠেকাতে ২০২০ সাল থেকে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে জিওটিউব ও জিওব্যাগের বাঁধ নির্মাণ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও অনেক এলাকায় সৈকতের ভাঙন থামেনি। বরং কোথাও কোথাও ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, সৈকত রক্ষার জন্য নির্মিত বাঁধে ব্যবহারের জন্য বাইরে থেকে বালু আনার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে বাঁধের আশপাশ থেকেই মেশিন দিয়ে বালু তুলে ব্যবহার করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাঁধ থেকে মাত্র ১০ থেকে ১৫ ফুট দূরত্বের জায়গা থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। এভাবে বালু তোলার ফলে সমুদ্রতল ও সৈকতের বালুর স্তরে গভীর গর্ত তৈরি হচ্ছে। জোয়ারের পানিতে এসব গর্ত ঢেকে যাওয়ায় বাইরে থেকে তা সহজে বোঝাও যায় না। ফলে পর্যটকরা স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে বা পানিতে নামতে গিয়ে হঠাৎ গভীর গর্ত কিংবা চোরাবালিতে পড়ে বিপদে পড়ছেন।
পরিবেশবাদীদের দাবি, গত কয়েক বছরে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পড়ে অন্তত ২০ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা) কক্সবাজারের সদস্যসচিব এইচএম ফরিদুল আলম শাহীন বলেন, গত ১৮ বছরে সৈকতের গুপ্তখাল ও চোরাবালিতে পড়ে অন্তত ১৩১ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের পাশাপাশি জিওব্যাগের বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের কারণে সৈকতের বিভিন্ন অংশে নতুন নতুন ঝুঁকিপূর্ণ স্থান তৈরি হয়েছে। কিন্তু এসব কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ হচ্ছে।
_20260823_122116686.jpg)
তিনি আরও বলেন, সৈকত থেকে বালু উত্তোলন শুধু পরিবেশের ক্ষতি করছে না, পর্যটকদের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। বিষয়টি বন্ধে নিয়মিত নজরদারি ও কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সৈকত থেকে বালু চুরি বন্ধে মাঝেমধ্যে অভিযান চালানো যথেষ্ট নয়। রাতের বেলায় বালু উত্তোলন ঠেকাতে নিয়মিত টহল, নজরদারি ও প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সৈকতের কোথায় কোথায় গভীর গর্ত, গুপ্তখাল বা চোরাবালি তৈরি হয়েছে, তা জরুরি ভিত্তিতে চিহ্নিত করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে পর্যটন মৌসুমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সতর্কবার্তা, সাইনবোর্ড এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছেন পরিবেশকর্মীরা।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, প্রকৃতি ও পর্যটন দুই দিক থেকেই কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই সৈকতের বালু রক্ষায় বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নজরদারি। অন্যথায় রাতের আঁধারে চলতে থাকা বালু লুটের খেসারত দিতে হতে পারে সৈকতের পরিবেশ ও পর্যটকদের জীবন দিয়ে।
আরও পড়ুন
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান , সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলন অত্যন্ত ভয়াবহ বিষয়। এতে সৈকতের স্বাভাবিক গঠন ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুফাঁদ তৈরি হতে পারে। অভিযোগ তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনোভাবেই সৈকত থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করতে দেওয়া হবে না।
প্রতিনিধি/টিবি




