করোনা মহামারির সময় স্বজন হারানোর ভয় ও আতঙ্কে অনেকেই আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া বাবা-মা, ভাই-বোন কিংবা নিকটাত্মীয়ের কাছে যেতে চাননি। এমনকি শেষবারের মতো বিদায় জানাতেও আসেননি অনেকে। দাফন-কাফন বা সৎকারের সময়ও পাশে দাঁড়াননি স্বজনেরা। এমন পরিস্থিতিতে এগিয়ে এসেছিল কুমিল্লার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘বিবেক’।
করোনাকালে মাত্র ১১ জন সদস্য নিয়ে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন বিবেকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও বর্তমান কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু। তার নেতৃত্বে সংগঠনের সদস্যরা কুমিল্লার ১৭ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী দাফন ও সৎকার করেন। সংগঠনের দাবি, এ পর্যন্ত ৫০০ জনের বেশি মৃত ব্যক্তির দাফন ও সৎকার করেছে বিবেক।

বুধবার (১৯ আগস্ট) দুপুরে বিবেক প্রতিষ্ঠার কথা তুলে ধরে ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, ‘করোনাকালে মাত্র ১১ জনকে নিয়ে বিবেকের যাত্রা শুরু হয়। এখন সংগঠনের সদস্য প্রায় ৫০০ জন। কুমিল্লা শহর থেকে জেলার ১৭ উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের নিজ নিজ ধর্মীয় রীতিতে সৎকার করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, করোনাকালে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ, অসহায় মানুষের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, প্লাজমা ও রক্তের ব্যবস্থা করাসহ বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে বিবেক। এসব কাজ সংগঠনের সদস্যদের নিজস্ব অর্থায়নে করা হয়েছে। কার্যক্রম শুরুর আগে সদস্যরা নিজ নিজ পরিবারের অনুমতি নেন। পাশাপাশি জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়ে তাঁরা কাজ শুরু করেন।
বিবেকের নামকরণ প্রসঙ্গে ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, ‘করোনায় আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেলে ছেলে বাবার লাশ কিংবা বাবা ছেলের লাশ দাফন করতে এগিয়ে আসতেন না। এমন মর্মান্তিক ঘটনা দেখে নিজের বিবেকের তাগিদে বিবেক প্রতিষ্ঠার উপলব্ধি বোধ করি।’

জেলা মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক মওদুদ আবদুল্লাহ শুভ্র বলেন, করোনাকালে ইউসুফ মোল্লা টিপু বিবেক প্রতিষ্ঠা করে নানা মানবিক কাজে এগিয়ে আসেন। করোনায় আক্রান্ত রোগীদের বাড়িতে অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়া, হাসপাতালে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের সৎকার এবং অসহায়দের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণসহ বিভিন্ন কাজ করেছেন সংগঠনের সদস্যরা। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে কুমিল্লার যেখানেই করোনায় আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেছেন, সেখানেই ছুটে গিয়ে সৎকার করেছেন তারা। এমনকি ঈদের দিনেও একাধিক মৃতদেহ সৎকার করেছেন বিবেকের সদস্যরা।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) কুমিল্লা জেলা সভাপতি শাহ মোহাম্মদ আলমগীর খান বলেন, করোনাকালে আক্রান্ত রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা ও প্লাজমা সংগ্রহসহ বিভিন্ন মানবিক কাজে ইউসুফ মোল্লা টিপু ও বিবেকের সদস্যরা নিজেদের নিয়োজিত রেখেছিলেন। এখনো সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তারা বিভিন্ন মানবিক কাজ করছেন। দরিদ্র পরিবারের মেয়ের বিয়েতে সহায়তা, অসহায় মানুষের চিকিৎসা, রমজানে ছিন্নমূল মানুষের মধ্যে ইফতার বিতরণসহ নানা কাজে সংগঠনটি যুক্ত রয়েছে। এ কারণে কুমিল্লার নগরবাসীর কাছে ইউসুফ মোল্লা টিপু ‘মানবিক প্রশাসক’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।

কুমিল্লার জেলা সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর মোহাম্মদ বশীর আহমেদ বলেন, ‘করোনাকালের দুর্যোগে যখন পরিবারের সদস্যরা মৃত ব্যক্তিদের লাশ ফেলে চলে যেতেন, তখন বিবেক এগিয়ে এসেছে। এখন পর্যন্ত কুমিল্লায় বিবেকের কার্যক্রম প্রশংসনীয়।’
করোনাকালে স্বজনদের অনুপস্থিতিতে মৃত ব্যক্তিদের দাফন ও সৎকারের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করা বিবেক এখন বিভিন্ন মানবিক ও সামাজিক কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ইউসুফ মোল্লা টিপুর ভাষায়, ‘বিবেকের তাগিদেই বিবেক প্রতিষ্ঠার উপলব্ধি বোধ করি।’
প্রতিনিধি/এসএস




