বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

স্বামীর সমাধি নেই, হারিয়েছেন ভিটাও-মধুমতীর পাড়ে রূপা রানীর কান্না

অহিদুজ্জামান, পিরোজপুর থেকে
প্রকাশিত: ২০ আগস্ট ২০২৬, ১০:২৪ এএম

শেয়ার করুন:

স্বামীর সমাধি নেই, হারিয়েছেন ভিটাও-মধুমতীর পাড়ে রূপা রানীর কান্না
মধুমতীর পাড়ে দাঁড়িয়ে রূপা রানী। নদী কেড়ে নিয়েছে স্বামীর সমাধি, সাতটি ভিটেমাটি।

পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী সাচিয়া বাজার ও আশপাশের এলাকায় তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। মধুমতী নদীর ভাঙনে ইতোমধ্যে কয়েকটি দোকান ও বসতঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। ৪০ বছর ধরে চলা ভাঙন নতুন করে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে গত ১০ আগস্ট। এতে অন্তত সাতটি দোকান ও বসতঘর নদীতে তলিয়ে গেছে। একের পর এক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বসতভিটা হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, তীব্র স্রোতে প্রতিনিয়ত ভেঙে পড়ছে নদীতীরের স্থাপনা। ইতোমধ্যে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ ভবনটিও নদীগর্ভে চলে গেছে। ঐতিহ্যবাহী সাচিয়া বাজারের মসজিদ, মন্দিরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। যেকোনো সময় এসব স্থাপনা নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

chadpur-2
মধুমতীর ভাঙনে ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী সাচিয়া বাজার ও আশপাশের এলাকা নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। ছবি: ঢাকা মেইল।

ভাঙনের তাণ্ডবে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে বহু পরিবার। সহায়-সম্বল ও ভিটেমাটি হারিয়ে অনেকে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ কেউ মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে উঠেছেন ভাড়া বাসায়। নদীকূলের মানুষের হাহাকার ও আতঙ্কে পুরো এলাকায় দেখা দিয়েছে মানবিক বিপর্যয়।

৭০ বছর বয়সী বিজলী বিশ্বাস জীবনের শেষ বয়সে এসে সরকারের কাছে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই চান। তিনি বলেন, সরকার উদ্যোগ নিলে বেড়িবাঁধ নির্মাণসহ কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে এই ভাঙন রোধ করা সম্ভব।

প্রায় ৮০ বছর বয়সী রূপা রানী দাস ছোটবেলায় বিয়ে হয়ে স্বামীর সংসারে এসেছিলেন সাচিয়া বাজারে। দীর্ঘদিনের নদীভাঙনে হারিয়েছেন স্বামীর সমাধির শেষ চিহ্নটুকুও। হারিয়েছেন সাতটি ভিটাও। বর্তমানে অন্যের ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন। নতুন করে ভাঙন শুরু হওয়ায় পুরোনো ক্ষত আবারো যেন জেগে উঠেছে রূপা রানীর জীবনে। এতে চরম উদ্বেগে দিন কাটছে তার।

Chadpur-1
নদীর পাড়ে বসে বিজলী বিশ্বাস। জীবনের শেষ সময়ে এসে এখন তার চাওয়া শুধু একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই।

একসময় সাচিয়া বাজারের বড় ব্যবসায়ী ছিলেন কৃপা বিশ্বাস। মধুমতীর ভাঙনে আজ তিনি নিঃস্ব। কৃপা বিশ্বাস জানান, শত বছরের পুরোনো এই হাটটি টিকে থাকলে শত শত মানুষ জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন। তাই দ্রুত ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

এমন নিঃস্ব হওয়ার গল্পের শেষ নেই মধুমতীর পাড়ের মানুষের। কারও দোকান গেছে, কারও বসতভিটা, আবার কেউ হারিয়েছেন বংশপরম্পরায় ধরে রাখা শেষ স্মৃতিটুকুও।

ক্ষতিগ্রস্ত ও স্থানীয়দের দাবি, অস্থায়ীভাবে জিও ব্যাগ ফেলে এই ভয়াবহ নদীভাঙন ঠেকানো সম্ভব নয়। সাচিয়া বাজার, ধর্মীয় উপাসনালয় ও বসতভিটা রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে।

pirojpur-5
ভাঙন ঠেকাতে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও থামছে না মধুমতীর আগ্রাসন।

পিরোজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আবু জাফর মো. রাশেদ খান জানান, ‘ভাঙনের খবর পেয়ে আমাদের সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যের ডিও লেটারের ভিত্তিতে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। তবে ব্লক বা বেড়িবাঁধের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা করব।’

প্রতিনিধি/এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর