চাঁদপুরের চার নদী, খাল-বিল ও জলাশয়ে দেশীয় মাছের বংশবিস্তার ও জলজ জীববৈচিত্র হুমকির মুখে পড়েছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে নিষিদ্ধ কারেন্টজাল ও চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার। এসব জালে রেণু-পোনা থেকে শুরু করে ছোট-বড় প্রায় সব ধরনের মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী আটকা পড়ছে। এতে সাময়িকভাবে জেলেরা লাভবান হলেও দীর্ঘ মেয়াদে মাছের প্রাকৃতিক উৎপাদন ও জীববৈচিত্রে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন মৎস্য বিশেষজ্ঞরা।
মৎস্যবিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় সাড়ে তিন দশক আগে চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কারেন্টজালের ব্যবহার শুরু হয়। অত্যন্ত সূক্ষ্ম সুতায় তৈরি এ জালের ফাঁস এত ছোট যে রেণু-পোনা থেকে বিভিন্ন আকারের মাছ পর্যন্ত নির্বিচারে আটকা পড়ে। একই সঙ্গে অন্যান্য জলজ প্রাণীও এসব জালের শিকার হয়। ফলে মাছের প্রজনন ও জলজ পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য ব্যাহত হচ্ছে।
গত কয়েক বছরে চাঁদপুরের নদী, খাল ও বিলে নতুন করে বিস্তার ঘটেছে চায়না দুয়ারি জালের। লম্বা টিউবের মতো দেখতে এ ফাঁদ প্লাস্টিক বা নাইলনের রিং ও সূক্ষ্ম জালের সুতা দিয়ে তৈরি। এর একাধিক মুখ বা ‘দুয়ার’ থাকায় মাছ একবার ভেতরে ঢুকলে সহজে বের হতে পারে না। ফলে ছোট-বড় মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী এতে আটকা পড়ে।
চাঁদপুর সদর উপজেলার রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নের জেলে মো. ইউসুফ প্রধান বলেন, অধিকাংশ জেলেই কারেন্টজাল ব্যবহার করেন। তবে বড় ফাঁসের জাল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা নেই। ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার সব সময়ই নিষিদ্ধ। তার দাবি, প্রতিবছর চাঁদপুরে কয়েক কোটি টাকার কারেন্টজাল ব্যবহার করেন জেলেরা।
তিনি বলেন, প্রকৃত জেলেরা সাধারণত চায়না দুয়ারী জাল ব্যবহার করেন না। মৌসুমি কিছু জেলে এসব জাল ব্যবহার করেন। এমনকি অনেকে বাড়ির আশপাশের মাঠ ও জলাশয়েও এসব ফাঁদ পেতে মাছ ধরেন।

সদর উপজেলার তরপুরচণ্ডী ইউনিয়নের জেলে ইসমাইল দেওয়ান বলেন, তাদের জেলেপাড়ার অধিকাংশ মানুষ নদীতে ইলিশ ধরেন এবং চায়না দুয়ারী জাল ব্যবহার করেন না। অল্প কিছু মানুষ এ ধরনের জাল ব্যবহার করেন। তাদের সচেতন করা জরুরি। কারণ এসব জালে মাছের পাশাপাশি অন্যান্য জলজ প্রাণীও ধ্বংস হচ্ছে।
চাঁদপুর সদর উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, কারেন্টজালের বিরুদ্ধে সারা বছরই অভিযান পরিচালনা করা হয়। সম্প্রতি চায়না দুয়ারী জালও জব্দ করে ধ্বংস করা হচ্ছে। তবে এসব জাল নদীতে পেতে জেলেরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকায় অনেক সময় তাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, শুধু অভিযান ও জাল ধ্বংস করলেই হবে না, এসব জালের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জেলেদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
ইলিশ গবেষক ড. আনিছুর রহমান বলেন, পদ্মা-মেঘনায় ইলিশের পাশাপাশি দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের প্রাপ্যতাও কমেছে। এর অন্যতম কারণ সূক্ষ্ম ফাঁসের কারেন্টজালের ব্যবহার। নদীতে এ জাল পেতে রাখলে কোনো মাছই এর বাধা এড়িয়ে যেতে পারে না। চায়না দুয়ারী জালও একইভাবে মাছ ধ্বংসকারী একটি ফাঁদ।
তার মতে, এসব ক্ষতিকর জালের ব্যবহার দ্রুত বন্ধ করতে কার্যকর সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে শুধু জেলেদের নয়, জলাশয় ব্যবহারকারী সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
চাঁদপুরের নদী-খাল-বিলের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে দেশীয় মাছের অস্তিত্বও জড়িত। তাই সাময়িক লাভের জন্য নির্বিচারে মাছ ধরা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে নদী-খালে মাছের সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিনিধি/এসএস




