মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

জেলা প্রশাসকের হোমওয়ার্ক: ব্যতিক্রমী সহায়তায় সাদিয়ার জিপিএ-৫ অর্জন

সুমন চন্দ্র, দিনাজপুর
প্রকাশিত: ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩১ পিএম

শেয়ার করুন:

জেলা প্রশাসকের হোমওয়ার্ক: ব্যতিক্রমী সহায়তায় সাদিয়ার জিপিএ-৫ অর্জন
সাদিয়া আফরিন

সাহায্যের আশায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়েছিলেন এক অসহায় মা। কিন্তু আর্থিক অনুদান দেওয়ার বদলে জেলা প্রশাসক তার মেয়েকে ধরিয়ে দিলেন পড়ার বই আর প্রতিদিনের রুটিন। আর্থিক সহায়তার পরিবর্তে পড়া আদায়ের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ পাল্টে দিয়েছে এক শিক্ষার্থীর জীবনযাত্রার গতিপথও।

ঘটনাটি গত বছরের জুলাই মাসের। মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার আকুতি নিয়ে জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলামের কাছে আর্থিক সহায়তার আবেদন করেছিলেন আরফা বেগম। প্রথম দিন কোনো টাকা না দিয়ে ডিসি সাহেব আরফার মেয়ে সাদিয়াকে সাত দিনের পড়া বুঝিয়ে দেন এবং প্রতি বুধবার এসে তা বুঝিয়ে দিতে বলেন। একই সঙ্গে বেঁধে দেন কঠোর রুটিন। শর্ত ছিল, এই রুটিন মানলে চার মাস পর মিলবে আর্থিক সহায়তা। তবে শিক্ষার্থীর আগ্রহ ও প্রচেষ্টা দেখে পরের মাসেই তাকে ৭ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। সেই সাদিয়া এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন। সমাজের প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে প্রশাসনের এমন অভিনব ও শিক্ষাবান্ধব উদ্যোগ এখন মানুষের মুখে মুখে প্রশংসিত হচ্ছে।

067303f7-15c6-4151-ba98-799bb039d0d9

সাদিয়া আফরিন দিনাজপুর সদর উপজেলার কাদের বকস মেমোরিয়াল হাই স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলেন। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টি থেকে একমাত্র সাদিয়াই জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন।

সাদিয়া দিনাজপুর সদর উপজেলার মাসিমপুর সরকারপাড়ার সেলিম-আরফা দম্পতির মেয়ে। সেলিম মিল শ্রমিক আর আরফা সেলাই করা আয়ে তিন সন্তানকে নিয়ে কোনো রকমে তাদের সংসার চলত। সাদিয়ার পরিবারের ঘরে নেই পড়ার জন্য আলাদা কোনো টেবিল-চেয়ার। বিছানা কিংবা মেঝেতে বসেই বই-খাতা নিয়ে পড়তে হয় তাকে। প্রায় দুই শতক জায়গার ওপর ছোট্ট একটি ঘর তাদের। সেই অভাবের মধ্যেও পড়াশোনা থামেনি তার। বরং স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে গেছেন তিনি। জেলা প্রশাসকের দেওয়া পড়ার রুটিন আর নিয়মিত ‘বাড়ির কাজ’ শেষ করার সেই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত তাকে এনে দিয়েছে সাফল্য।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত বছর জুলাইয়ে মেয়ের পড়াশোনার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আর্থিক সহায়তার আবেদন করেছিলেন আরফা বেগম। এক সপ্তাহ পরে মেয়েসহ জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করেন আরফা। এ সময় জেলা প্রশাসক তাদের পরিবারের খোঁজখবর নেন। পড়াশোনা নিয়ে সাদিয়াকে নানা প্রশ্ন করেন। সেদিন বেশির ভাগ প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাক দিতে পারেনি সাদিয়া। প্রথম দেখার দিনেই জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম আর্থিক সহায়তা করেননি। বরং তিনি সাত দিনের বাড়ির পড়া ঠিক করে দিয়ে প্রতি বুধবার গণশুনানির দিন সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এসে পড়া দিতে বলেন। ঠিক করে দেন প্রতিদিনের পড়াশোনার রুটিনও।

জেলা প্রশাসক সাদিয়াকে বলেন, রাতে দুই ঘণ্টা আর ভোরে দুই ঘণ্টা পড়তে হবে। রাত ১০টায় ঘুমাবে এবং ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠবে। বিকেলে এক ঘণ্টা খেলবে। ক্লাস হোক বা না হোক, প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাবে। রুটিন অনুসরণ করলে চার মাস পর আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দেন। যদিও পরের মাসেই সাদিয়াকে দেওয়া হয় সাত হাজার টাকা।

9a0a1b7a-0c55-461f-ad55-850915534a2c

সাদিয়ার বাবা সেলিম বলেন, সাদিয়া খুবই মেধাবী। সে পুরো স্কুলের মধ্যে একমাত্র জিপিএ-৫ পেয়েছে। কিন্তু এমন ফলাফলের পরও মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। মেয়ে ডাক্তার হতে চায়। কিন্তু সামনে তার পড়াশোনা করানোর মতো আমাদের সামর্থ্য নেই।

মা আরফা বেগম বলেন, এক বছর আগে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ায় স্বামীর টাকা দিয়ে সংসার চালানো খুবই কষ্ট হয়ে পড়েছিল। তখন মানুষের কাছে শুনেছিলাম যে, জেলা প্রশাসক পড়ালেখার জন্য আর্থিক সাহায্য করেন। এই জন্য আমি মেয়েকে নিয়ে ডিসি স্যারের কাছে যাই। তিনি আমার মেয়েকে বাড়ির কাজ দেন। আমার মেয়ে সেই মোতাবেক পড়াশোনা করে। আজ মেয়ের এমন ফলাফলে আমরা খুবই খুশি।

 

সাদিয়া আফরিন বলেন, জেলা প্রশাসক স্যার আমাকে যেভাবে বলেছেন, আমি সেভাবেই পড়াশোনা করেছি। আমি জিপিএ-৫ পেয়েছি। আমি পড়াশোনা করে ডাক্তার হতে চাই। আমি সকলের সেবা করতে চাই।

কাদের বকস মেমোরিয়াল হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মকসেদ আলী বলেন, সাদিয়া আফরিন খুবই মেধাবী ছাত্রী। তার ফলাফলে আমরা খুবই খুশি।

প্রতিনিধি/টিবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর