সাতক্ষীরা সদর থানা হাজতের ভেতরে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুদুর রহমানকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে।
একই ঘটনায় ডিউটি অফিসার পিংকি রায় ও সহকারী ডিউটি অফিসার এনিভা খাতুনকেও বদলি করা হয়েছে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ এ সিদ্ধান্ত নেয়।
গত ১৫ আগস্ট সাতক্ষীরা শহরের সুলতানপুর এলাকা থেকে জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী আকতার হোসেন, কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মাস্টার শফিকুল ইসলাম, জেলা তাঁতী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন এবং পৌর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শেখ মোস্তাফিজুর রহমান শোভনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
অভিযোগ ওঠে, থানার ভেতরে ওসির বিশেষ অনুমতি নিয়ে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মী হাজতের সামনে গিয়ে গ্রেফতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ভিডিও ধারণ করেন। পরে ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওতে জেলা তাঁতী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেনকে হাজতের ভেতর থেকে বক্তব্য দিতে দেখা যায়।
তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আজ ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পুলিশ আমাদের অন্যায়ভাবে ধরে নিয়ে এসেছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।’
এ সময় তাকে ‘শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে’সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক স্লোগান দিতেও দেখা যায়।
সদর থানার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত ১৫ আগস্ট দুপুর সাড়ে ২টার দিকে জেলা তাঁতী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আলমগীর কবিরসহ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী থানায় অবস্থান করছিলেন। এ সময় আর্জেন্টিনার জার্সি পরা এক ব্যক্তি থানায় এসে অনুমতি নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেন এবং ভিডিও ধারণ করেন।
ঘটনাটির ভিডিও থানার সিসিটিভি ক্যামেরায় সংরক্ষিত রয়েছে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।

সদ্য প্রত্যাহার হওয়া ওসি মাসুদুর রহমানের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন অভিযোগ ওঠার দাবি করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। সম্প্রতি সাতক্ষীরা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে এক সাংবাদিক ও এক জমিদাতা সিন্ডিকেটের হামলার শিকার হওয়ার ঘটনায় উল্টো ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা এবং পাল্টাপাল্টি মামলা দেওয়ার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ভুক্তভোগীদের সহযোগিতা করার পরিবর্তে আর্থিক বা রাজনৈতিক স্বার্থে কাউন্টার মামলা বা পাল্টাপাল্টি মামলা দেওয়ার প্রবণতা ছিল। তার এমন ভূমিকার কারণে জেলা ছাত্রদলের সিনিয়র সহসভাপতি মনজুরুল আলম বাপ্পিসহ নেতাকর্মীদের ওপর চিহ্নিত ব্যক্তিরা হামলার সাহস পেয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ১৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড বাড়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
এসব ঘটনার প্রতিবাদে সোমবার বিকেলে ওসির স্থায়ী অপসারণ ও শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন করে সাতক্ষীরা জেলা ছাত্রদল।
ঘটনাটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) কামরুজ্জামান ভুট্টো।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পরও দলটির নেতাকর্মীরা বিভিন্ন সময় সাতক্ষীরায় নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছেন। এসব ঘটনায় সদর থানার ওসির পক্ষ থেকে সব সময় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না।
কামরুজ্জামান ভুট্টো বলেন, সম্প্রতি কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী গ্রেফতার হওয়ার পর থানা হাজতের ভেতরে তাদের দিয়ে ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ঘটনায় শুধু ওসিকে বদলি করাই যথেষ্ট নয়, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তবে ভিডিও ধারণের ঘটনা সম্পর্কে ভিন্ন কথা বলেছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মিথুন সরকার।
তিনি বলেন, ভিডিও ধারণের বিষয়টি তাদের জানা নেই। আর ওসিসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তার বদলির বিষয়টি নিয়মিত বদলির অংশ।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাতক্ষীরা সদর থানার সদ্য প্রত্যাহার হওয়া ওসি মাসুদুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
প্রতিনিধি/এলএ




