বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়লেও জাতীয় বাজেটে এ খাত এখনো উপেক্ষিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কৃষির বৃহত্তর খাতের সঙ্গে প্রাণিসম্পদকে একীভূত করে দেখায় এর প্রকৃত গুরুত্ব প্রতিফলিত হচ্ছে না। খাদ্য ও পশুচিকিৎসা ব্যয় বাড়লেও সাম্প্রতিক বাজেট চক্রে প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতে বরাদ্দ কমেছে। এতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা।
বন্যা, জলাবদ্ধতা ও অন্যান্য দুর্যোগে খড়-বিচালির মজুত নষ্ট হওয়া, খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং রোগবালাইয়ের প্রাদুর্ভাব—সব মিলিয়ে প্রাণিসম্পদ খাতকে প্রতিবছর নানা সংকট মোকাবিলা করতে হয়। অথচ এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ও লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) এনিম্যাল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ এনিম্যাল হাজবেন্ড্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ড. মো. আবুল হাশেম বলেন, প্রাণিসম্পদ এখন আর ক্ষুদ্র কৃষকের বাড়তি আয়ের উৎস নয়; এটি গ্রামীণ জীবিকা, পুষ্টি ও রফতানি সম্ভাবনার অন্যতম চালিকাশক্তি। কিন্তু বাজেট এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) ঢাকা মেইলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
_20260814_111949168.jpg)
কৃষি বাজেটের অংশ কমছে
প্রাণিসম্পদ খাতে বাজেট বরাদ্দের বিষয়ে অধ্যাপক আবুল হাশেম বলেন, জাতীয় ব্যয়ে কৃষির সামগ্রিক অংশ কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। যদিও নামমাত্র বরাদ্দ কিছুটা বেড়েছে, অর্থনীতিবিদ ও কৃষক সংগঠনগুলো কৃষি খাতে মোট বাজেটের প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে।
তার মতে, কৃষি খাতের প্রকৃত অর্থনৈতিক ও খাদ্যনিরাপত্তাগত গুরুত্ব বিবেচনায় এ বরাদ্দ প্রয়োজন। কিন্তু প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাত ঐতিহাসিকভাবেই কৃষি বরাদ্দের তুলনামূলক ছোট অংশ পেয়ে আসছে।
সবচেয়ে বেশি চাপে ক্ষুদ্র খামারি
বরাদ্দ না বাড়লে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিদের ওপর চাপ আরও বাড়বে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। তার ভাষায়, খাদ্য ও পশুচিকিৎসা ব্যয়ের চাপ তাদেরই সবচেয়ে বেশি বহন করতে হবে। কারণ ভর্তুকি ও অন্যান্য সহায়তার বড় অংশ শেষ পর্যন্ত বড় উৎপাদকদের কাছে চলে যায়। ফলে যাদের সহায়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তারা তুলনামূলকভাবে কম সুবিধা পান।

জলবায়ু ঝুঁকিতে প্রাণিসম্পদ
বাংলাদেশের উপকূলীয়, হাওর ও বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোতে বিপুলসংখ্যক গবাদিপশু রয়েছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে প্রাণিসম্পদ খাতও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অধ্যাপক আবুল হাশেম বলেন, প্রাণিসম্পদকে কৃষির একটি গৌণ বিষয় হিসেবে দেখার কারণে লাখ লাখ গ্রামীণ পরিবার এমন ঝুঁকির মুখে পড়ছে, যা যথাযথ অর্থায়নের মাধ্যমে অনেকাংশে মোকাবিলা করা সম্ভব।
দুর্যোগ মোকাবিলায় তিনি উপকূল, হাওর ও বন্যাপ্রবণ এলাকায় বন্যা-প্রতিরোধী আধুনিক খামারঘর নির্মাণ, সাইলেজ, খড় ও দানাদার খাদ্যের মজুত এবং সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য বিশেষ বাজেটের দাবি জানান। পাশাপাশি দুর্যোগের আগে গবাদিপশুকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, দুর্যোগ-পরবর্তী টিকাদান ও রোগ প্রতিরোধে পৃথক তহবিল গঠনের ওপর গুরুত্ব দেন।
শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না
অধ্যাপক আবুল হাশেমের মতে, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই প্রাণিসম্পদ খাতের সমস্যার সমাধান হবে না; ব্যয়ের অগ্রাধিকারও বদলাতে হবে। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি সহনশীলতা গড়তে পাঁচটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন—জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো, ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা, রোগ নজরদারি ও জৈবনিরাপত্তা, দেশীয় খাদ্য ও প্রজনন গবেষণা এবং খামারিদের প্রশিক্ষণ ও সম্প্রসারণ সেবা।
_20260814_112040388.jpg)
তিনি বলেন, উপকূলীয় ও হাওর এলাকায় উঁচু ও বন্যা-প্রতিরোধী খামারঘর এবং খাদ্য মজুত কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে। ভর্তুকি ও স্বল্প সুদের ঋণ দিতে হবে বিশেষভাবে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিদের খাদ্য ও টিকা কেনার জন্য।
একই সঙ্গে রোগের প্রাদুর্ভাব বড় ধরনের ক্ষতি করার আগেই শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে প্রাণিসম্পদ অধিফতরের জন্য টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
আমদানিনির্ভরতা কমানোর তাগিদ
দেশীয় পশুখাদ্য ও প্রজনন গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন অধ্যাপক আবুল হাশেম। তার মতে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত খাদ্য ও উন্নত প্রজনন কর্মসূচিতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে আমদানিকৃত খাদ্য ও উপকরণের ওপর নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে খামারিদের কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে নতুন বিনিয়োগ উৎপাদনশীলতায় রূপ নেয়।

বিলম্বের মূল্য দিতে হবে খামারিদের
বাজেট সিদ্ধান্তে বিলম্বের পরিণতি সম্পর্কে তিনি বলেন, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো না থাকায় প্রতিটি বন্যা মৌসুমেই প্রাণিসম্পদ খাতে নতুন করে ক্ষতি হচ্ছে। খাদ্য ও টিকার ব্যয় অপরিকল্পিত ভর্তুকির ওপর ছেড়ে রাখলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ক্ষুদ্র খামারিরাই।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। তাই ভবিষ্যতে বৈদেশিক সুবিধাজনক সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে খাদ্যনিরাপত্তা ও গ্রামীণ আয় ধরে রাখতে প্রাণিসম্পদ খাতে কার্যকর বাজেট বিনিয়োগ জরুরি।
সংসদ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বান
জাতীয় সংসদ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতি অধ্যাপক আবুল হাশেমের সুপারিশ, প্রাণিসম্পদকে কৃষির একটি উপ-খাত হিসেবে না দেখে খাদ্যনিরাপত্তা ও জলবায়ু অভিযোজন কৌশলের স্বতন্ত্র স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা।
তিনি বলেন, ‘জলবায়ু-সহনশীল প্রাণিসম্পদ খাত গড়ে তোলার কারিগরি জ্ঞান বা প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব বাংলাদেশের নেই। যা নেই, তা হলো সেই উচ্চাভিলাষের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি বাজেট।’ তার মতে, প্রাণিসম্পদের জন্য স্বতন্ত্র বরাদ্দ ও সুনির্দিষ্ট ব্যয়কৌশল থাকা প্রয়োজন।
প্রতিনিধি/এসএস




