শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

নাব্যতা সংকট ও কচুরিপানায় নবাবগঞ্জে ইছামতীর নৌকাবাইচে ভাটা

শওকত আলী রতন, দোহার-নবাবগঞ্জ (ঢাকা)
প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩৯ এএম

শেয়ার করুন:

নাব্যতা সংকট ও কচুরিপানায় নবাবগঞ্জে ইছামতীর নৌকাবাইচে ভাটা

একসময় ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার ইছামতী নদীতে ভাদ্র মাসজুড়ে বসত নৌকাবাইচের জমজমাট আসর। দেড় যুগ আগেও নদীর অন্তত ২৫টি পয়েন্টে আয়োজন করা হতো ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিযোগিতা। নৌকাবাইচ দেখতে নদীর দুই পাড়ে জড়ো হতেন লক্ষাধিক দর্শনার্থী। তবে কচুরিপানা, নাব্যতা-সংকট, নদী দখল ও দূষণের কারণে সেই ঐতিহ্য এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে।

ইছামতীর নৌকাবাইচ ছিল এ অঞ্চলের অন্যতম বড় বিনোদন আয়োজন। ‘দাদা-নাতি’, ‘সোনার তরী’, ‘মাসুদ রানা’, ‘আল্লার দান’, ‘লিটন দেওয়ান’ ও ‘রাজ’সহ বিভিন্ন নামে ঘাসি নৌকা প্রতিযোগিতায় অংশ নিত। শুধু বিনোদন নয়, এই নৌকাবাইচকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছিল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও।

স্থানীয় লোকজন জানান, বাংলা সনের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী শত বছর ধরে ভাদ্র মাসের ১ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত ইছামতীর বিভিন্ন স্থানে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। তবে নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, কচুরিপানার বিস্তার, নদী ভরাট, দখল-দূষণ এবং আধুনিক বিনোদনের প্রসারের কারণে আগের সেই মাসব্যাপী আয়োজন এখন আর নেই। বর্তমানে স্থানীয় উদ্যোগে বছরে এক-দুটি প্রতিযোগিতা হলেও অতীতের সেই প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসেনি।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০০০ সালে ইছামতী নদীর উৎপত্তিস্থল সোনাবাজু এলাকায় পদ্মা নদীর ওপর আড়াআড়ি বাঁধ দেওয়ার পর নৌকাবাইচে ভাটা পড়ে। একদিকে নাব্যতা-সংকট, অন্যদিকে কচুরিপানায় নদী ভরে যাওয়ায় দাউদপুর থেকে বান্দুরা পর্যন্ত কয়েকটি এলাকায় নৌকাবাইচ বন্ধ হয়ে যায়।

47ca8845-4cf0-49f1-a41b-ba5317df240e

২০১০ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া নৌকাবাইচ পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয় নৌকাবাইচ ঐতিহ্য রক্ষা জাতীয় কমিটি। কচুরিপানা অপসারণ করে কয়েকটি স্থানে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।

উপজেলার সুজাপুর গ্রামের বাসিন্দা শওকত হোসেন বলেন, গত ১০ বছর ধরে দাউদপুরের নৌকাবাইচ বন্ধ রয়েছে। সুজাপুর ক্লাবের উদ্যোগে প্রতিবছর ভাদ্র মাসের ৫ তারিখে সেখানে নৌকাবাইচ হতো। কিন্তু কচুরিপানার কারণে কয়েক বছর ধরে তা আর হচ্ছে না। পদ্মা নদী থেকে ইছামতীর সঙ্গে সরাসরি সংযোগ দেওয়া হলে নৌকাবাইচ আবার চালু করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন। এতে কৃষিকাজেও প্রাণ ফিরবে বলে তার ধারণা।

চিত্রশিল্পী আননূর বলেন, ‘নদীকে আমি শুধু জলাধারের উৎস হিসেবে দেখি না। নদী আমাদের জীবন ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইছামতীর নাব্যতা ফিরিয়ে দিতে হবে। কচুরিপানার কারণে শত বছরের ঐতিহ্য বন্ধ হয়ে থাকবে—এটা মেনে নেওয়া যায় না। নদী হারিয়ে গেলে একসময় আমরাও হারিয়ে যাব।’

চিকিৎসক হরগোবিন্দ্র অনুপ বলেন, প্রকৃতি প্রতিনিয়ত নানা উপায়ে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখছে। অথচ প্রকৃতিকে টিকিয়ে রাখতে আমরা কী করছি, সে বিষয়ে আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে।

2923e7c2-acfb-42ab-ad6d-71d7419e9363

নৌকাবাইচ ঐতিহ্য রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক রাশিম মোল্লা বলেন, ‘নদীকে টিকিয়ে রাখতে আমাদের রীতিমতো সংগ্রাম করতে হচ্ছে। প্রতি বছর নৌকাবাইচের সময় ঘনিয়ে এলে কচুরিপানা অপসারণ নিয়ে ভাবতে হয়। কচুরিপানা সরিয়ে আমরা কোনোভাবে প্রতিযোগিতার আয়োজন করে যাচ্ছি। কিন্তু এভাবে আর কতদিন চলবে, জানি না। স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।’

তিনি আরও বলেন, দোহার উপজেলার কার্তিকপুর ও নবাবগঞ্জ উপজেলার সোনাবাজু এলাকায় পদ্মা নদীর বাঁধের মুখ খুলে দিলে ইছামতীতে স্বাভাবিক নাব্যতা ফিরতে পারে। ইছামতী নদী রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের প্রতি দাবি জানান তিনি।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ইছামতীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, কচুরিপানা অপসারণ এবং দখল-দূষণ বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে শুধু নৌকাবাইচের ঐতিহ্যই ফিরবে না, নদীকেন্দ্রিক কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর