ঠিকাদারি ও আউটসোর্সিং প্রথা বিলুপ্ত করে সরাসরি চাকরি স্থায়ীকরণ, শ্রম আইন অনুযায়ী ন্যায্য অধিকার ও কর্মসংস্থানের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন দাবিতে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের (বিএটিবি) শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেছেন। দাবি আদায় না হলে দেশের সব রিজিয়নে সর্বাত্মক অবরোধসহ আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুর ১২টার দিকে দৌলতপুর উপজেলার শিল্পনগরী আল্লারদর্গায় অবস্থিত বিএটিবির কার্যালয়ের সামনে সড়কে এ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়। এ সময় এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
‘বিএটিবি ফিল্ড টেকনিশিয়ান ও অফিস স্টাফ শ্রমিক কল্যাণ ইউনিয়ন’-এর ব্যানারে আয়োজিত কর্মসূচিতে শ্রমিকরা বিভিন্ন দাবিতে স্লোগান দেন। সংগঠনের নেতারা জানান, ২০১০ সাল থেকে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে তাঁরা বিএটিবির মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন স্থায়ী প্রকৃতির কাজ করে আসছেন। এর মধ্যে তামাকচাষি নির্বাচন, চুক্তি সম্পাদন, বীজ ও সার বিতরণ, মাঠ পর্যবেক্ষণ, তামাক সংগ্রহ এবং কোম্পানির বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক অ্যাপ পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে।
শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, অতীতে এসব পদে স্থায়ী জনবল নিয়োজিত থাকলেও অতিরিক্ত মুনাফার উদ্দেশ্যে বহুজাতিক কোম্পানিটি ধীরে ধীরে এসব কাজ ঠিকাদারি ও আউটসোর্সিং ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসে। দীর্ঘদিন একই ধরনের স্থায়ী কাজ করলেও তাঁদের চাকরির ন্যূনতম নিরাপত্তা নেই। একই সঙ্গে শ্রম আইন অনুযায়ী প্রাপ্য বাৎসরিক লভ্যাংশ (ডব্লিউপিপিএফ) থেকেও তাঁদের বঞ্চিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
আন্দোলনকারীদের দাবি, শ্রম আইন ২০০৬-এর বিধিমালার ২০১৫ সালের ১৬(৫) এবং ২০২২ সালের ১৮(২) ধারার আলোকে তাঁদের চাকরি স্থায়ীকরণের আইনি অধিকার রয়েছে। এ বিষয়ে চলমান আন্দোলনের মধ্যে গত ৩ আগস্ট রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে একটি শুনানিও অনুষ্ঠিত হয় বলে জানান শ্রমিক নেতারা।
তাঁদের আরও অভিযোগ, আইনি অবস্থান শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় ২০ জন নেতাকে দূরবর্তী স্থানে বদলি করেছে। পাশাপাশি ৩৮ জন কর্মীর নামে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে হয়রানি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
দাবি আদায়ে গত ২০ জুলাই থেকে দুই দফায় মোট ১৭ দিন কর্মবিরতি পালন করেন শ্রমিকরা। এরপরও কার্যকর সমাধান না হওয়ায় গত ৬ আগস্ট থেকে তাঁরা আবারও ১০ দিনের পূর্ণাঙ্গ কর্মবিরতি পালন করছেন।
শ্রমিকরা বলেন, ঠিকাদারি প্রথার ‘আধুনিক দাসত্ব’ থেকে মুক্তি পেয়ে বিএটিবিতে সরাসরি স্থায়ী নিয়োগ না পাওয়া পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন চলবে। চলমান কর্মবিরতির মধ্যেই সমস্যার সমাধান না হলে দেশের সব রিজিয়নে সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হবে। এ সময় মাঠপর্যায়ে কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হলে এর দায় বিএটিবি কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তাঁরা।
সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি আরিফুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক সামিউল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পলাশ, সদস্য গিয়াস উদ্দিনসহ অন্যান্য নেতাকর্মী ও শ্রমিকরা বিক্ষোভে উপস্থিত ছিলেন।
শ্রমিক সংগঠনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর অধীনে সারা দেশে আটটি রিজিয়নে মোট ৩৮৬ জন ফিল্ড টেকনিশিয়ান ও অফিস স্টাফ রয়েছেন। এর মধ্যে কুষ্টিয়া ডিভিশনের অধীনে ছয়টি এবং চট্টগ্রাম ডিভিশনের অধীনে দুটি রিজিয়ন রয়েছে। আল্লারদর্গা লিফ রিজিয়ন, চেচুয়া লিফ রিজিয়ন, ঝিনাইদহ রিজিয়ন, মেহেরপুর রিজিয়ন, মানিকগঞ্জ রিজিয়ন ও নারায়ণগঞ্জ রিজিয়নের পাশাপাশি চট্টগ্রাম উত্তর ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ রিজিয়নের শ্রমিকরাও আন্দোলনে যুক্ত রয়েছেন। এছাড়া রংপুর রিজিয়নেও শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে।
শ্রমিকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর স্থায়ী প্রকৃতির কাজ করলেও বিএটিবি তাঁদের সরাসরি নিয়োগপত্র দেয়নি। বেতন পরিশোধে অনিয়ম, অতিরিক্ত সময় কাজ করিয়ে ওভারটাইম ভাতা না দেওয়া এবং সাপ্তাহিক ছুটি ও অন্যান্য আইনগত সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগও করেছেন তাঁরা।
তবে শ্রমিকদের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, “সব শ্রমিককে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তাঁদের পাওনা পরিশোধ করা হয়।”
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিনিধি/ এজে




