বয়স যে কেবলই একটা সংখ্যা এবং ইচ্ছা ও অধ্যবসায় থাকলে যে কোনো বয়সেই স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব—তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার কাঠমিস্ত্রী নাসিমুল হক। দীর্ঘ বিরতির পর ৪৫ বছর বয়সে এসে সফলতার সঙ্গে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি।
সোমবার (১০ আগস্ট) প্রকাশিত ফলাফলে জানা যায়, রাজশাহী কমার্স কলেজের ভোকেশনাল শাখা থেকে জিপিএ ৪.৬২ পেয়ে পাস করেছেন তিনি। তার এই সাফল্য ঘিরে পরিবার, সহপাঠী ও এলাকাবাসীর মধ্যে বইছে আনন্দের বন্যা। প্রতিবেশীরা তাকে মিষ্টি খাইয়ে অভিনন্দন জানাচ্ছেন এবং আনন্দ উৎসবে মেতে উঠেছেন।
ভোলাহাট উপজেলার তিলোকী গ্রামের বাসিন্দা নাসিমুল পেশায় একজন কাঠমিস্ত্রী। নকশাদার কাঠের কাজের পাশাপাশি তিনি ভোলাহাট উপজেলা ফার্নিচার শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
নাসিমুল জানান, এর আগে ২০০২ সালে মানবিক (আর্টস) বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেবার ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া এবং পরিবারের চরম আর্থিক সংকটের কারণে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। জীবিকার তাগিদে তিনি কাঠের কাজকে মূল পেশা হিসেবে বেছে নেন।
দীর্ঘদিন পড়াশোনা থেকে দূরে থাকলেও শেখার আগ্রহ তার কখনোই কমেনি। কয়েক বছর আগে স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি পদে নির্বাচন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন নাসিমুল। তবে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকায় তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। এই সামাজিক অভিজ্ঞতাই তাকে নতুন করে আবার বই-খাতা হাতে তুলে নিতে অনুপ্রাণিত করে।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালে তিনি রাজশাহী কমার্স কলেজের ভোকেশনাল শাখায় ভর্তি হন। কাঠমিস্ত্রীর ব্যস্ত কাজের ফাঁকেও নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং পরিশেষে ২০২৪ সালের প্রচেষ্টায় সফলতা অর্জন করেন।
নিজের এই সাফল্যে উচ্ছ্বসিত নাসিমুল বলেন, শিক্ষাগত যোগ্যতার অভাবে যখন বিদ্যালয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে পারিনি, তখনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম আবারও পড়াশোনা শুরু করব। ২০২৪ সালে কলেজে ভর্তি হয়ে সেই চেষ্টা চালিয়ে যাই। আজ এসএসসি পাস করতে পেরে খুব ভালো লাগছে। ইচ্ছে আছে সামনে কলেজে ভর্তি হয়ে যতদূর সম্ভব পড়াশোনা এগিয়ে নেওয়ার।
নাসিমুলের এই অদম্য যাত্রাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন শিক্ষক সমাজ ও স্থানীয়রা।
রাজশাহী কমার্স কলেজের শিক্ষক মাসুদ রানা জানান, নাসিমুল তাদের নিয়মিত ও অত্যন্ত মনোযোগী শিক্ষার্থী ছিলেন। বয়স বেশি হলেও ক্লাসের বিষয়ে তার আগ্রহ ছিল অন্যদের চেয়ে বেশি।
তিনি বলেন, কোনোদিন ক্লাসে উপস্থিত হতে না পারলে তিনি ফোন করে পড়া জেনে নিতেন এবং নোট সংগ্রহ করতেন। সহপাঠীদের থেকেও সাহায্য নিতেন। তার এই শেখার আগ্রহ সত্যিই প্রশংসনীয়।
ভোলাহাট উপজেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মো. লোকমান আলী বলেন, ৪৫ বছর বয়সে নাসিমুলের এই সাফল্য অত্যন্ত আনন্দের ও অনুপ্রেরণাদায়ক। তিনি যদি সামনে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চান, তবে আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।
প্রতিনিধি/টিবি




