চিত্রা নদীর পাড়ে জন্ম নেওয়া ‘লাল মিয়া’ একদিন রঙ-তুলির আঁচড়ে বাংলার কৃষক, মাটি ও মানুষের অন্তর্গত শক্তিকে তুলে ধরে হয়েছিলেন বিশ্ববরেণ্য শিল্পী এস এম সুলতান। ক্যানভাসে তার পেশিবহুল কৃষক যেন বাংলার মাটি ও মানুষের অদম্য শক্তিরই প্রতিচ্ছবি। আজ তার ১০৩তম জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে নড়াইলে শ্রদ্ধা আর স্মরণে ফিরে আসবে সেই কিংবদন্তির কথা। তবে শিল্পীর স্মৃতিবিজড়িত সংগ্রহশালাটি এখনো রয়েছে সীমাবদ্ধ পরিসরে। সুলতানের স্মৃতি ও শিল্পকর্ম ঘিরে এটিকে পূর্ণাঙ্গ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন তা কতদূর সে প্রশ্নও আজ সামনে আসবে।
বিশ্বখ্যাত বাংলাদেশি চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের চিত্রকর্মের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল গ্রামীণ জীবন ও অতিবলিষ্ঠ পেশিবহুল কৃষক সমাজ। তার বিখ্যাত শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে চর দখল, ধান কাটা, পাট কাটা, কৃষকের সংগ্রাম ও আমার গ্রাম, উল্লেখযোগ্য।

তথ্য অনুযায়ী, চিত্রশিল্পের মূল্যায়ন হিসেবে এস এম সুলতান ১৯৮২ সালে একুশে পদক ও ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন। এছাড়াও দেশ-বিদেশে অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হন। ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর শিল্পী সুলতানের মৃত্যুর পর তার স্মৃতি সংরক্ষণে ২০০৩ সালে প্রায় এক একর জমির ওপর স্মৃতি সংগ্রহশালা ও শিশুস্বর্গ তৈরি করা হয়। এছাড়া শিল্পীর নামে একটি আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
জানা গেছে, শিশুস্বর্গে বর্তমানে সপ্তাহে দুদিন শিশুরা ছবি আঁকা শেখেন। কোমলমতি এসব শিশুরা শিল্পী এসএম সুলতানের মতো চিত্রশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ছবি আঁকা শিখছে।
শিশু শিক্ষার্থী অজিহা কবির জানায়, সে সপ্তাহে দুদিন আর্ট শিখতে আসে। প্রাকৃতিক দৃশ্য, নদী, খাল, বিল, এসএম সুলতান, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, জুলাই যোদ্ধাসহ বিভিন্ন বিষয়ের উপরে ছবি আঁকা শিখেছে। বড় হয়ে এস এম সুলতানের মত শিল্পী হতে চায়।

এসএম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালায় রয়েছে শিল্পীর আঁকা দুর্লভ কিছু ছবি ও তার ব্যবহার্য জিনিসপত্র। সংগ্রহশালায় বর্তমানে শিল্পী সুলতানের ২৩টি দুর্ভল চিত্রকর্ম এবং ৫৩টি রেপ্লিকা রয়েছে। শিল্পীর আরও চিত্রকর্ম থাকলেও স্থান সংকুলান না হওয়ায় প্রদর্শন করা যাচ্ছে না। তবে সংগ্রহশালাটি সম্প্রসারণের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয় ২০২৪ সালের দিকে। জমি অধিগ্রহণসহ প্রায় পাঁচ কোটি টাকার ওই প্রকল্প প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে জমা আছে।

মাত্র প্রায় এক জমির ওপর স্থাপনা দেখে ঘুরে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত দশরথীরা পরিপূর্ণ আত্মতৃপ্তি পান না। রাজধানীর মিরপুর থেকে কলেজছাত্রী হাসিবা ইসলাম তার পরিবারের সঙ্গে ঘুরতে এসেছিলেন সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালায়। শিল্পীর ছবিগুলো দেখে ভালো লেগেছে। তবে জায়গা কম হয় অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইমা তার বান্ধবীকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে এসেছিল সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালায়। তিনি এস এম সুলতানের নৌকাটিকে (ভাসমান শিশুস্বর্গ) মেরামত করে নদীতে ভাসানোর দাবি জানান।
এসএম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালার কিউরেটর তন্দ্রা মুখার্জী বলেন, পদ্মা সেতু ও মধুমতি সেতু চালুর পর এসএম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহলায় দর্শনার্থী বেড়েছে। বর্তমানে শিল্পী সুলতানের ২৩টি দুর্লভ চিত্রকর্ম এবং ৫৩টি রেপ্লিকা রয়েছে। শিল্পীর আরো চিত্রকর্ম থাকলেও স্থান সংকুলান না হওয়ায় প্রদর্শন করা যাচ্ছে না। সংগ্রহশালাটিকে পর্যটন বান্ধব করতে জমি অধিগ্রহণসহ কিছু স্থাপনা নির্মাণের জন্য এটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন হলে সুলতান সংগ্রহশালাটি একটি পর্যটন কেন্দ্রে রূপ নেবে।

তিনি বলেন, সুলতানের নৌকাটির একটি রেপ্লিকা তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। রেপ্লিকাটি তৈরি করা গেলে আগের মত শিশু শিক্ষার্থীরা নৌকায় ভেসে ভেসে মনের আনন্দে ছবি আঁকতে পারবে। পাশাপাশি দর্শনার্থীরাও ইচ্ছা করলে নৌকাটি ব্যবহার করে বিনোদনের সুযোগ পাবে। এ ব্যাপারে আশা করি প্রকল্পটি অনুমোদন হলে সংগ্রহশালার পরিধি বাড়বে এবং পর্যটনবান্ধব হয়ে উঠবে।
উল্লেখ্য, ১৯২৩ সালের ১০ আগস্ট তৎকালীন মহকুমা শহর নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন শেখ মোহাম্মদ সুলতান। তার ডাক নাম ‘লাল মিয়া’। ৭০ বছরের বোহেমিয়ান জীবনে তিনি তুলির আঁচড়ে দেশ, মাটি, মাটির গন্ধ আর ঘামে ভেজা মেহনতি মানুষের সাথে নিজেকে একাকার করে বিখ্যাত সব ছবি সৃষ্টি করেছেন।
তার উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্মের আছে মধ্যে আছে— পাট কাটা, ধান কাটা, ধান ঝাড়া, ধান মাড়াই, ধান ভানা, চর দখল, জমি কর্ষণে যাত্রা, মাছ ধরা, নদীর ঘাটে, গুন টানা, ফসল কাটার ক্ষণে, শরতের গ্রামীণ জীবন, শাপলা তোলা- নামের কালজয়ী ছবি।
এই চিত্রশিল্পীকে ১৯৮২ সালে একুশে পদক, ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের রেসিডেন্স আর্টিস্ট হিসেবে স্বীকৃতি, ১৯৮৬ সালে চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদক প্রদান করা হয়। ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোরের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে কালোত্তীর্ণ শিল্পী সুলতান মৃত্যুবরণ করেন।
প্রতিনিধি/টিবি




