রোববার, ৯ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

কুমিল্লায় দিন দিন বাড়ছে শব্দদূষণ, অতিষ্ঠ নগরবাসী

সাকলাইন যোবায়ের, কুমিল্লা
প্রকাশিত: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪২ পিএম

শেয়ার করুন:

কুমিল্লায় দিন দিন বাড়ছে শব্দদূষণ, অতিষ্ঠ নগরবাসী
কুমিল্লার শাসনগাছা বাস টার্মিনাল

যান্ত্রিক সভ্যতার আগ্রাসন আর অপরিকল্পিত নগরায়ণে ঢাকা পড়ছে কুমিল্লা শহর। একসময় যে শহরের পরিবেশ ছিল কোলাহলমুক্ত, আজ তা পরিণত হয়েছে তীব্র শব্দের এক কারখানায়। এখানকার মানুষের ঘুম ভাঙে কর্কশ শব্দে, আর রাত কাটে নানা শব্দের অস্বস্তিতে। শব্দদূষণের এই লাগামহীন দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।

সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মাইকের যথেচ্ছ ব্যবহার। আবাসিক এলাকায় অটোরিকশা তৈরির গ্যারেজে বা দোকানে লোহা ও এসএস স্টিল কাটার তীব্র শব্দ। ঘর-বাড়ি তৈরি করার জন্য ইট-কংক্রিট ভাঙার ও টাইলস কাটার মেশিনের শব্দে অতিষ্ট নগরবাসি। গাড়ির হাইড্রোলিক হর্নের বিকট শব্দ, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সাউন্ডবক্স দিয়ে গান বাজনার শব্দ দূষনের কবলে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে নগরবাসীর জীবন। এতে বৃদ্ধ, শিশু ও রোগীসহ সাধারণ মানুষের জন্য বিরক্তির কারণ হচ্ছে।

এদিকে, শব্দ দূষণের মাত্রা বাড়ায় শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫ কঠোরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এতে সর্বসাধারণকে বিধিমালার বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) প্রকাশিত গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শব্দদূষণ মানবস্বাস্থ্য, জনজীবন ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ কারণে এলাকা ভেদে শব্দের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। নীরব এলাকায় সর্বোচ্চ ৫০ ডেসিবেল এবং মিশ্র এলাকায় সর্বোচ্চ ৭৫ ডেসিবেল শব্দমাত্রা অনুমোদিত। কোনো উচ্চ শব্দ উৎপন্নকারী যন্ত্র বা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নির্ধারিত শব্দমাত্রা অতিক্রম করা যাবে না। কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া পারিবারিক অনুষ্ঠান, সামাজিক আয়োজন বা জনসমাবেশে উচ্চ শব্দের সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করা যাবে না। অনুমতি পেলেও শব্দমাত্রা ৯০ ডেসিবেলের বেশি এবং ব্যবহারের সময় ৫ ঘণ্টার বেশি হতে পারবে না। নির্ধারিত শব্দমাত্রা অতিক্রমকারী যেকোনো ধরনের হর্নের উৎপাদন, আমদানি, মজুত, বিক্রি, বিতরণ, বাজারজাতকরণ, পরিবহন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ। নীরব এলাকায় হর্ন বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পাশাপাশি পটকা, আতশবাজি বা শব্দদূষণ সৃষ্টি করে এমন যেকোনো কার্যক্রমও নিষিদ্ধ। আবাসিক এলাকায় রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত হর্ন বাজানো যাবে না। কিন্তু শব্দ দূষণের এসকল আইনের তোয়াক্কা করা হচ্ছে না।

নগরীর তেলিকোনা চৌমুহনীর ব্যবসায়ী মো. কাইয়ুম বলেন, মাইক ব্যবহার করে রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংগঠনের সভা-সমাবেশ, বিভিন্নধর্মীয় অনুষ্ঠানে মাইকের ব্যবহার, গান-বাজনা, সার্কাস, মেলা, লটারির টিকেট বিক্রি, রাস্তার পাশে ওষুধ বিক্রি, পণ্য সামগ্রীর প্রচার, মাইক বাজিয়ে ভিক্ষা বৃত্তি, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের আচার অনুষ্ঠানে উচ্চ আওয়াজে মাইক ও লাউড স্পিকার ফুল সাউন্ড দিয়ে বাজানো হয়ে থাকে। এছাড়াও কুমিল্লার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ছাদের ওপরে মাইকের ব্যবহার করা হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।

মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিক মওদুদ আবদুল্লাহ শুভ্র বলেন, কুমিল্লায় শব্দ দূষণ অতিরিক্ত মাত্রায় বেড়ে গেছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে শব্দদূষণ বন্ধের প্রতি জোড় দেওয়া হলেও এবং কঠোর আইন থাকায় শব্দ দূষণ করতে সাহস পায় না। আমাদের দেশে এ সম্পর্কে আইনের তেমন প্রয়োগ নেই। তাই শব্দদূষণ বাড়ছে।

562a36be-1296-49e3-80f6-8af7cd1721db

পরিবেশ অধিদপ্তর কুমিল্লার উপ-পরিচালক মোসাব্বের হোসেন মোহাম্মদ রাজিব বলেন, কুমিল্লার ৯ এলাকায় শব্দদূষণের মাত্রা বেশি। এগুলো হলো— শাসনগাছা বাস টার্মিনাল, জাঙ্গালিয়া বাস টার্মিনাল, কান্দিরপাড়, টমছম ব্রিজ, রাজগঞ্জ মোড়, চকবাজার, পদুয়ার বাজার, আলেখারচর ও কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ-সংলগ্ন এলাকা। এর মধ্যে শাসনগাছা, জাঙ্গালিয়া ও কান্দিরপাড়ে শব্দের তীব্রতা বেশি।

ডা. মো. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, কুমিল্লায় শব্দদূষণ ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। কেউ কোনো আইন মানে না।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সভাপতি শাহ্ মোহাম্মদ আলমগীর খাঁন বলেন, আমাদের দেশে শব্দ দূষণ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। আইনে যথাযথ প্রয়োগ না থাকার কারণে আবাসিক এলাকায় কলকারখানা, অটোরিকশা গ্যারেজসহ নানাভাবে শব্দ দূষণ প্রতিনিয়ত বাড়ছেই। মানুষের মাঝে বিবেকবোধ ও সচেচনতার সৃষ্টি না হলে শব্দ দূষণ বাড়তে থাকবে আইন প্রয়োগ করে তা বন্ধ করা যাবে না।

 

রোববার (৯ আগস্ট) সকালে কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক)  মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, আমরা ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসক এবং কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়ে শব্দদূষণের প্রতিকার নিয়ে সভা করছি। সভায়  শহরের অটো এবং বিভিন্ন যানবাহনের হাইড্রলিক্স হর্নের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা টিপু জানান, শব্দদূষণ প্রতিকারের জন্য কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। যা অতি দ্রুত প্রয়োগ করা হবে।

প্রতিনিধি/টিবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর