ছোটবেলা থেকেই আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন ছিল পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার ১৫ বছর বয়সী কিশোর ফাহিম শাহরিয়ারের। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ইউটিউব দেখে নিজের হাতে তৈরি করেছে রিমোট নিয়ন্ত্রিত ক্ষুদ্র বিমান। সেই বিমান আকাশে সফলভাবে উড়িয়ে এখন আলোচনায় ফাহিম।
তেঁতুলিয়া পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে ফাহিমের তৈরি বিমানের সফল উড্ডয়ন দেখতে শতাধিক মানুষ ভিড় করেন। রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে পরিচালিত বিমানটি মাটি ছেড়ে আকাশে উড়তে শুরু করলে উপস্থিত দর্শকেরা করতালি দিয়ে ফাহিমকে অভিনন্দন জানান।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিমানটি স্বচ্ছন্দে আকাশে উড়তে এবং সফলভাবে অবতরণ করতে দেখে তারা বিস্মিত ও আনন্দিত হয়েছেন। তাদের মতে, ফাহিমের এই উদ্যোগ এলাকার অন্য তরুণদেরও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর কাজে আগ্রহী করে তুলবে।

ফাহিম শাহরিয়ার নীলফামারীর সৈয়দপুর বিজ্ঞান কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাড়ি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার শালবাহান ইউনিয়নের কালান্দিগঞ্জ কুমারটোল গ্রামে। তার বাবা মুহাম্মদ বাকী বিল্লাহ সৈয়দপুর বিজ্ঞান কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।
ফাহিম জানায়, ১২ বছর বয়স থেকেই বিমান তৈরি ও ওড়ানোর স্বপ্ন দেখে সে। সেই স্বপ্ন পূরণের পথে তার সবচেয়ে বড় শিক্ষক ছিল ইউটিউব। বিভিন্ন ভিডিও দেখে বিমান তৈরির কৌশল শেখে সে। তবে প্রথম দিকে দুবার চেষ্টা করেও সফল হয়নি। টিফিনের টাকা জমিয়ে এবং বাবা-মায়ের সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করে সে বারবার চেষ্টা চালিয়ে যায়। দীর্ঘ দুই বছরের পরিশ্রমের পর তৃতীয়বারের চেষ্টায় বিমানটি তৈরি করতে সক্ষম হয় ফাহিম।

ফাহিমের তৈরি বিমানটির ওজন প্রায় ৫০০ গ্রাম। এটি একটি মাঝারি আকারের ট্রেইনার বিমান। এর উইংস্প্যান ৪০ ইঞ্চি এবং ফিউজলেজের দৈর্ঘ্য ২৮ দশমিক ৫ ইঞ্চি। বিমানটি প্রায় এক কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত উড়তে সক্ষম।

বিমানটিতে ব্যবহার করা হয়েছে শক্তিশালী ব্রাশলেস ডিসি মোটর ও দিকনির্দেশনা নিয়ন্ত্রণের জন্য সার্ভো মোটর। এ ছাড়া রয়েছে ফ্লাইস্কাই এফএস-আই৬এক্স রিমোট কন্ট্রোল এবং রেডিওলিংক বাইম-এ ফ্লাইট কন্ট্রোলার।

নিজের সাফল্যের অনুভূতি জানিয়ে ফাহিম শাহরিয়ার বলে, ‘বিমানটি যখন প্রথমবার আকাশে উড়ল, তখন মনে হয়েছিল আমার সব পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। শুরুতে অনেকে আমাকে পাগল বলত। কিন্তু এখন সবাই প্রশংসা করছে। ভবিষ্যতে আমি একজন ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই। আরও উন্নত ড্রোন ও বিমান প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে দেশের জন্য অবদান রাখতে চাই।’
ছেলের সাফল্যে গর্বিত বাবা বাকী বিল্লাহ বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই ফাহিমের মধ্যে সৃষ্টিশীলতার আগ্রহ ছিল। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই সে কার্টন দিয়ে বিভিন্ন ধরনের মডেল তৈরি করত। বিমান তৈরির বিষয়টি প্রথমে অবাস্তব মনে হলেও তার আত্মবিশ্বাস দেখে আমি সহযোগিতা করেছি। বারবার ব্যর্থ হওয়ার পরও সে হাল ছাড়েনি—এটাই সবচেয়ে বড় বিষয়।’

তেঁতুলিয়ার আইসিটি শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘বর্তমান সময়ে অনেক কিশোর যখন সময়ের অপচয় করছে, তখন ফাহিম নিজের মেধা ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে উদ্ভাবনী কাজ করেছে। তার এই অর্জন অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য অনুকরণীয় ও অনুপ্রেরণাদায়ক।’
স্থানীয় শিক্ষকেরা মনে করেন, ফাহিমের মতো মেধাবী ও উদ্ভাবনী কিশোরদের যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হলে তারা ভবিষ্যতে দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।
প্রতিনিধি/এসএস




