শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

সর্পদংশনের চিকিৎসায় আশার আলো, বোচাগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাফল্য

সুমন চন্দ্র, দিনাজপুর
প্রকাশিত: ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১১:২১ এএম

শেয়ার করুন:

সর্পদংশনের চিকিৎসায় আশার আলো, বোচাগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাফল্য
বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

সন্ধ্যা নামার আগমুহূর্ত। বাড়ির আঙিনায় কুকুর-বিড়ালের মারামারি থামাতে ছুটে গিয়েছিলেন সাদিয়া আক্তার। প্রাণীদের ঝগড়া থামিয়ে বারান্দায় উঠছিলেন তিনি। ঠিক তখনই পায়ের কাছে ছোবল মারে একটি সাপ। মুহূর্তেই তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার করে ওঠেন সাদিয়া।

সাদিয়ার চিৎকারে ছুটে আসেন স্বামী তরিকুল ইসলাম। সাপটি কী ছিল, তা বোঝার সুযোগ না নিয়ে স্ত্রীকে দ্রুত নিয়ে যান বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে চিকিৎসকেরা দংশনস্থানে সাপের কামড়ের চিহ্ন শনাক্ত করে তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখেন। কিছুক্ষণ পর সাদিয়ার শরীরে বিষক্রিয়ার নিউরোলজিক্যাল লক্ষণ দেখা দিলে জাতীয় চিকিৎসা প্রটোকল অনুযায়ী দ্রুত প্রয়োগ করা হয় অ্যান্টিভেনম।

সময়মতো চিকিৎসা, চিকিৎসক-নার্সদের সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম শেষ পর্যন্ত বিষধর সাপের ছোবল হার মানে চিকিৎসকদের কাছে। সুস্থ হয়ে ওঠেন সাদিয়া।

সাদিয়ার মতো আরও ২৮ জন সর্পদংশনের রোগীকে গত ৩২ দিনে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছেন বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকেরা। তাদের মধ্যে চারজন ছিলেন গোখরা সাপের কামড়ে আক্রান্ত। গুরুতর এসব রোগীর চিকিৎসা ছিল চিকিৎসকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সঠিক সময়ে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ ও নিবিড় পর্যবেক্ষণে চারজনকেই সুস্থ করে তুলতে সক্ষম হন তারা।

6f467251-1a3f-433d-bfd6-0cd5f01de6ac

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত মোট ২৯ জন সর্পদংশনের রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন এখানে। তাদের মধ্যে চারজনকে হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। চারজনই ছিলেন গোখরা সাপের কামড়ে আক্রান্ত এবং তাদের সবাই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

গুরুতর চার রোগীর মধ্যে গত ৫ আগস্ট হাসপাতালে ভর্তি হন সাদিয়া আক্তার। এর আগে ২৫ জুলাই দফচাই গ্রামের সাদেকুল (২১), ১০ জুলাই জালগাঁও গ্রামের সুজন চন্দ্র রায় (২৭) এবং ৪ জুলাই কাহারোল উপজেলার তারগাঁও গ্রামের প্রকৃত চন্দ্র রায় (৪৩) ভর্তি হন। চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় অ্যান্টিভেনম প্রয়োগে তারা সবাই সুস্থ হয়ে ওঠেন।

এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এখন স্থানীয় মানুষের কাছে সর্পদংশনের চিকিৎসার একটি নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল হয়ে উঠছে।

সাদিয়ার চিকিৎসায় নেতৃত্ব দেওয়া হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মো. আবদুল্লাহ ইবনে এনাম বলেন, সীমিত সম্পদের মধ্যেও সঠিক সিদ্ধান্ত ও শক্তিশালী টিমওয়ার্কের মাধ্যমে আরও একটি প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়েছে।

তিনি বলেন, সাপ না চিনলেও বা সাপটিকে না দেখতে পেলেও সময় নষ্ট না করে সরাসরি হাসপাতালে চলে আসাই ছিল রোগীর প্রাণ বাঁচানোর সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।

তিনি আরও বলেন, প্রতিটি নতুন প্রাণ বেঁচে যাওয়ার পর রোগীর স্বজনদের মুখের স্বস্তির হাসি আমাদের কাজের সব ক্লান্তি দূর করে দেয়।

12bc7842-93af-47c2-8c4c-2e29f4a3757e

সর্পদংশনের রোগীদের চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অ্যান্টিভেনম। উপজেলা পর্যায়ে অনেক সময় এই ওষুধের সংকট দেখা দেয়। ফলে রোগীকে জেলা শহরের হাসপাতালে পাঠাতে গিয়ে মূল্যবান সময় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এই সংকট মোকাবিলায় বোচাগঞ্জ উপজেলা পরিষদের উদ্যোগে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যান্টিভেনম সরবরাহ করা হচ্ছে। বর্তমানে হাসপাতালে সর্পদংশনের চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম মজুত রয়েছে ।পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টা জরুরি চিকিৎসাসেবাও চালু রয়েছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বিজয় কুমার রায়ের সার্বিক তত্ত্বাবধানে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় সর্পদংশনের রোগীদের চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে।

বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বিজয় কুমার রায় বলেন, বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ সাপের কামড়ের ঘটনায় ঝাড়ফুঁক, কুসংস্কার বা চিকিৎসায় বিলম্ব না করে দ্রুত হাসপাতালে আসার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। কারণ, সময়মতো সঠিক চিকিৎসা ও প্রয়োজন অনুযায়ী এন্টিভেনম প্রয়োগের মাধ্যমে অধিকাংশ সর্পদংশনের রোগীকেই সুস্থ করে তোলা সম্ভব।

5dc4b561-78dc-42fb-b850-e8abcfc3d2ec

বোচাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মারুফ হাসান বলেন, উপজেলায় সাপের কামড়ের রোগী বাড়ছে। অনেক রোগী হাসপাতালে এলেও অর্থের অভাবে অ্যান্টিভেনম কিনতে পারেন না। আবার কখনো স্থানীয় ফার্মেসিতে অ্যান্টিভেনম পাওয়া যায় না। ফলে চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হয়।

তিনি বলেন, উপজেলা পর্যায়ে অ্যান্টিভেনম না থাকলে অনেক রোগীকে জেলা শহরের হাসপাতালে পাঠাতে হয়। পথের দূরত্ব ও সময়ের কারণে চিকিৎসা শুরুতে বিলম্ব হলে রোগীর জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এসব বিষয় বিবেচনায় উপজেলা পরিষদের উদ্যোগে হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম সরবরাহ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এতে করে মানুষের যেমন উপকার হয়, তেমনি চিকিৎসক নার্সরাও উৎসাহিত হয়। আর এতে করে বেঁচে যায় সাপে কাটা রোগীদের প্রাণ। হাসপাতালে বলা আছে যখনি অ্যান্টিভেনম মজুদ কমে আসবে। আমাকে জানা মাত্রই আমরা সঙ্গে সঙ্গে নতুন অ্যান্টিভেনম সরবাহ করে দিবো। সাপে কাঁটা রোগীদের ঝাঁড়ফুঁক না করে দ্রুত হাসাপাতালে আসার জন্য সকলের প্রতি আহবান জানান।

প্রতিনিধি/টিবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর