দক্ষিণাঞ্চলের জলপথঘেরা পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর-কুড়িয়ানা এলাকায় শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ভাসমান পেয়ারার হাট। ‘বাংলার ভেনিস’ খ্যাত এ জনপদে ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় পেয়ারা কেনাবেচার ব্যতিক্রমী দৃশ্য স্থানীয় অর্থনীতির প্রাণচাঞ্চল্য বাড়ানোর পাশাপাশি দেশি-বিদেশি পর্যটকদেরও আকর্ষণ করছে। তবে পেয়ারার ন্যায্য দাম নিশ্চিত ও অপচয় কমাতে এলাকায় একটি জেলি কারখানা ও হিমাগার (কোল্ড স্টোরেজ) নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা।

পিরোজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ৭১০ হেক্টর জমিতে পেয়ারার আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ হাজার ২১০ মেট্রিক টন। প্রতি মৌসুমে এ ভাসমান হাটে ২০ কোটি টাকার বেশি পেয়ারা কেনাবেচা হয়।

প্রতিদিন ভোরে নেছারাবাদের আটঘর-কুড়িয়ানা, আদমকাঠি, জিন্দাকাঠীসহ আশপাশের খালগুলোতে ভেসে আসে শত শত পেয়ারাভর্তি ডিঙ্গি নৌকা। চাষিরা বাগান থেকে তাজা পেয়ারা তুলে এনে আড়তে বিক্রি করেন। এখানকার বড় আকারের ও সুস্বাদু পেয়ারার চাহিদা রয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, কুমিল্লা, বরিশাল, পটুয়াখালী ও ঝালকাঠিসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। বর্তমানে প্রতি মণ পেয়ারা বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায়। প্রতিকূল আবহাওয়ায় ফলন কিছুটা কম হলেও বাজারদর ভালো থাকায় সন্তুষ্ট ব্যবসায়ীরা।

পদ্মা সেতু চালুর পর সড়ক যোগাযোগ সহজ হওয়ায় পেয়ারা পরিবহনে গতি এসেছে। পাইকারি ব্যবসায়ীরা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে পেয়ারা কিনে ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠাচ্ছেন। এতে কৃষকেরাও তুলনামূলক ভালো দাম পাচ্ছেন।

শুধু ব্যবসা নয়, ভাসমান এ হাটকে ঘিরে গড়ে উঠেছে পর্যটনেরও বড় সম্ভাবনা। প্রতিদিনই খালের দুই পাশে পেয়ারাবাগান আর নৌকায় কেনাবেচার দৃশ্য দেখতে ভিড় করছেন অসংখ্য দর্শনার্থী। পর্যটকদের চাহিদা মেটাতে এলাকায় গড়ে উঠেছে বিভিন্ন পার্ক ও রেস্তোরাঁ। বিশেষ করে ভিমরুলির ‘ভাবীর হোটেল’-এর সরষে ইলিশ, ইলিশ ভর্তা, চিংড়ি ভুনা ও হাঁসের মাংসের খাবার পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়।

তবে পর্যটন সুবিধা আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন দর্শনার্থীরা। পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার কিঞ্জাল বলেন, ভাসমান হাটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসাধারণ। তবে পর্যটকদের নিরাপত্তা, মানসম্মত আবাসন ও খাবারের ব্যবস্থা আরও উন্নত করা প্রয়োজন।

পেয়ারার গুণগত মান ধরে রাখা এবং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে স্থানীয়ভাবে একটি জেলি কারখানা ও হিমাগার স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা।
বাগেরহাট থেকে আসা পাইকারি ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম বলেন, এখানকার পেয়ারার স্বাদ ও মান খুব ভালো। ভোরে এসে পেয়ারা কিনে বাগেরহাটে নিয়ে বিক্রি করি। বাজারে এ পেয়ারার চাহিদা অনেক।

ব্যবসায়ী মোস্তফা হাওলাদার বলেন, আবহাওয়ার কারণে এবার ফলন কিছুটা কম হলেও পেয়ারার মিষ্টতা ও মান ভালো থাকায় দামও ভালো পাওয়া যাচ্ছে।

চাষি অনুপম হালদার বলেন, ‘ফজরের পর থেকেই পেয়ারা পেড়ে নৌকায় করে হাটে আনি। ফলন কম হলেও ভালো দাম পাওয়ায় ক্ষতি পুষিয়ে যাচ্ছে। সরকার যদি একটি হিমাগার ও জেলি কারখানা করে দেয়, তাহলে আমরা আরও বেশি লাভবান হব।’

নেছারাবাদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমিত দত্ত বলেন, পর্যটক ও স্থানীয়দের সুবিধার্থে ইতোমধ্যে একটি নির্দেশনামূলক বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। পর্যটন ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে নিরাপত্তা, থাকা-খাওয়া ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট করতেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক (খামারবাড়ি) সৌমিত্র সরকার বলেন, কৃষকদের উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এখানে একটি মিনি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ করা গেলে মৌসুমে পেয়ারা সংরক্ষণ করে কৃষকেরা আরও বেশি লাভবান হবেন।

কৃষি ও পর্যটনের সম্ভাবনাময় এ ভাসমান পেয়ারার হাটে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, একটি হিমাগার এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে উঠলে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিনিধি/এসএস




