# পর্যটকের মৃত্যু
# ১ বছরে ৭ পর্যটক আহত
# প্রশাসন ম্যানেজ করে চলছে বছরের পর বছর
কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের দরিয়ানগর ও হিমছড়ি সৈকতে প্যারাসেইলিং যেন ক্রমেই মারণফাঁদে পরিণত হচ্ছে। এখানে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে বারবার আহত হন পর্যটকেরা। গত শনিবার (১ আগস্ট) প্রাণ গেছে এক পর্যটকের। এসব এলাকায় প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে গেল ১ বছরে অন্তত ৭ পর্যটক আহত হয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবছর মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এসব প্যারাসেইলিং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হলেও দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে দায় এড়াতে জেলা প্রশাসন বিষয়টি অস্বীকার করছে। এছাড়া পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় শর্ত, প্রশিক্ষিত জনবল, সরঞ্জামের মান ও নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত না করেই প্যারাসেইলিং পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়। ফলে একের পর এক দুর্ঘটনার পরও ঝুঁকিপূর্ণভাবে এই পর্যটন কার্যক্রম চালু রয়েছে। ফলে রোমাঞ্চকর এই জলক্রীড়া দিনকে দিন পর্যটকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শনিবার দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে নিরাপত্তা হারনেস থেকে ছিটকে সমুদ্রে পড়ে গুরুতর আহত হন পর্যটক অক্ষর শৌভিক রায় (৩০)। পরে তাঁকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তিনি খুলনা সদরের বানিয়াখামার এলাকার শেখর রায়ের ছেলে।

জানা গেছে, শনিবার সকালে নয় বন্ধু মিলে কক্সবাজারে বেড়াতে আসেন শৌভিক। দুপুরের দিকে তাঁরা দরিয়ানগর এলাকায় যান। সেখানে প্যারাসেইলিং করার সময় হঠাৎ নিরাপত্তা হারনেস থেকে ছিটকে সমুদ্রে পড়ে যান শৌভিক। প্যারাসেইলিং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. সুবক্তগীন মোহাম্মদ সোহেল বলেন, বেলা ২টা ১০ মিনিটে তাঁকে হাসপাতালে আনা হয়। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পানিতে পড়ে ডুবে যাওয়ার কারণে মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করা যাবে।
জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুল হাসান জানান, দুর্ঘটনার পর পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তা হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই চলছিল প্যারাসেইলিং :
দুর্ঘটনার পর জেলা প্রশাসনের বক্তব্যে আরও গুরুতর তথ্য সামনে এসেছে। জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে দুর্ঘটনার তিন দিন আগেই দরিয়ানগরসহ কক্সবাজারের সব প্যারাসেইলিং বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, সব ধরনের প্যারাসেইলিং বন্ধ ছিল। এর মধ্যে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্যারাসেইলিং করা হচ্ছিল। শনিবার এক পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে, যা দুঃখজনক। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। প্যারাসেইলিং করার জন্য প্রশাসন থেকে কাউকে অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে জানান ডিসি।
এর আগে দুর্ঘটনার পর প্যারাসেইলিং বন্ধ রাখার নজিরও রয়েছে। গত বছরের ৩০ আগস্ট দরিয়ানগর এলাকায় প্যারাসেইলিংয়ের সময় এক পর্যটক ছিটকে ঝাউগাছের সঙ্গে আটকে যান। পরে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় ‘স্যাটেলাইট ভিশন সি স্পোর্টস’ পরিচালিত প্যারাসেইলিং রাইডের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। পরদিন থেকে জেলা প্রশাসন সৈকতের সব ধরনের প্যারাসেইলিং কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়।

এরও আগে গত বছরের ২০ মে দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করার সময় এক নারী পর্যটক সমুদ্রে পড়ে আহত হন। ওই ঘটনার পর জেলা প্রশাসনের পর্যটন শাখার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ‘ফ্লাই এয়ার সি’ নামের প্রতিষ্ঠানের প্যারাসেইলিং কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। পরে অবশ্য কিছুদিন পর আবার কার্যক্রম শুরু হয়।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে নিয়ম ভেঙে একই সময়ে দুজনকে নিয়ে প্যারাসেইলিং করানো হয়েছিল। ওই ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সরঞ্জাম জব্দ করে কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, মেরিন ড্রাইভের দরিয়ানগর ও হিমছড়ি সৈকতে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে গেল ১ বছরে অন্তত ৭ জন পর্যটক আহত হয়েছেন।
অদক্ষ জনবল ও পুরোনো সরঞ্জামের অভিযোগ :
দরিয়ানগরে প্যারাসেইলিং পরিচালনা করছে ‘ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেইলিং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির মালিক মোহাম্মদ ফরিদ বলেন, তাঁদের চারটি প্যারাসেইলিং, দুটি জেট স্কি ও পাঁচটি স্পিডবোট রয়েছে। শনিবার তাঁর প্রতিষ্ঠানেই প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে এক পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয় পর্যটক ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দরিয়ানগর ও হিমছড়ি এলাকায় পরিচালিত প্যারাসেইলিং প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেরই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবল নেই। নিরাপত্তাসরঞ্জামের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পুরোনো ও নিম্নমানের লাইফ জ্যাকেটসহ অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার করার মতো প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দলও নেই।

প্যারাসেইলিংয়ের আগে পর্যটকদের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামা বা চুক্তিতে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। সেখানে দুর্ঘটনা ঘটলে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান দায় নেবে না-এমন শর্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ফলে নিজেদের নিরাপত্তার দায় পর্যটকদের ওপর চাপিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকিপূর্ণভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্যাটেলাইট ভিশন সি স্পোর্টসের ব্যবস্থাপক নুর মোহাম্মদ অবশ্য বলেন, প্যারাসেইলিং পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম রয়েছে। আকাশে ওড়ার আগে পর্যটকদের সেসব নিয়ম বুঝিয়ে দেওয়া হয়। নিচ থেকেও হ্যান্ডমাইকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়। অনেক সময় পর্যটকেরা নির্দেশনা অনুসরণ না করলে দুর্ঘটনা ঘটে।
১০ মিনিটের রোমাঞ্চে হাজারো টাকা :
প্যারাসেইলিং করতে পর্যটকদের কাছ থেকে সর্বনিম্ন দেড় হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫-৬ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সর্বোচ্চ ১০ মিনিটের এই রোমাঞ্চের জন্য নেওয়া হচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
সৈকতে ঘুরতে আসা পর্যটকদের অভিযোগ, নিয়ম না মেনে প্যারাসেইলিং পরিচালনার কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। বারবার এমন ঘটনায় পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় এই রোমাঞ্চকর বিনোদন এখন আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্যারাসেইলিং করতে আসা রাজশাহীর পর্যটক শরীফ জামিল বলেন, প্যারাসেইলিংয়ের সঙ্গে থাকা মোটা রশি সমুদ্রে থাকা স্পিডবোটের সঙ্গে যুক্ত থাকে। স্পিডবোট চললে সেটির টানে প্যারাসেইলিং আকাশে উঠে যায়। ওঠানামার বিষয়টি অনেকটাই যিনি প্যারাসেইলিং করেন তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকে। অনেকে আকাশে উঠে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। তখন ছিটকে পড়ার ঘটনা ঘটে। কিন্তু দ্রুত উদ্ধারের ব্যবস্থা না থাকায় এসব দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ছে।
১১৫ কিলোমিটার সৈকতে নেই লাইফগার্ড :
কক্সবাজারের দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতের বড় একটি অংশে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে বড় ঘাটতি। সৈকতে গোসলে নেমে নিখোঁজ পর্যটকদের উদ্ধার তৎপরতায় নিয়োজিত বেসরকারি সি-সেফ লাইফ গার্ডের সুপারভাইজার সিফাত সাইফুল্লাহ বলেন, শহরের কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সৈকতে ২৭ জন লাইফগার্ড নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু কলাতলী থেকে দক্ষিণ দিকে দরিয়ানগর, হিমছড়ি, ইনানী হয়ে টেকনাফ পর্যন্ত প্রায় ১১৫ কিলোমিটার সৈকতে কোনো লাইফগার্ড কিংবা ডুবুরি নেই। ফলে প্যারাসেইলিংয়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জলক্রীড়ায় দুর্ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক উদ্ধার তৎপরতা চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।

কক্সবাজার জেলা সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, প্যারাসেইলিংয়ের মালিকদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে কঠোরভাবে মনিটরিং করা উচিত। পর্যটক বা রাইডারদের ইনস্যুরেন্সের আওতায় আনা উচিত, যাতে দুর্ঘটনা ঘটলে তাঁরা ক্ষতিপূরণ পান। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও খতিয়ে দেখা দরকার।
প্রশ্ন উঠছে নজরদারি নিয়ে :
পরপর দুর্ঘটনা, সাময়িক নিষেধাজ্ঞা, আবার কার্যক্রম চালু দরিয়ানগর ও হিমছড়ির প্যারাসেইলিং ঘিরে এমন চিত্রই দেখা যাচ্ছে গত কয়েক বছর ধরে। সর্বশেষ বৈরী আবহাওয়ার কারণে প্রশাসন যখন সব ধরনের প্যারাসেইলিং বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছে, তখনও কীভাবে একটি প্রতিষ্ঠান সেখানে পর্যটক নিয়ে আকাশে উড়ছিল এখন সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।
পর্যটননির্ভর কক্সবাজারে নিরাপদ বিনোদন নিশ্চিত করতে প্যারাসেইলিং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা, সরঞ্জামের মান, প্রশিক্ষিত জনবল, আবহাওয়ার পূর্বাভাস মেনে চলা এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে প্রশাসনের অনুমতি ও শর্ত অমান্য করে কেউ কার্যক্রম পরিচালনা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।




