নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি মামলার মেডিকেল রিপোর্টে জালিয়াতির অভিযোগ তুলে জেলা সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী গৃহবধূ আশা আক্তারের (২১) স্বামী সালমান শাহ।
শনিবার (১ আগস্ট) জেলা সিভিল সার্জন ডা. গোলাম অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এরআগে গত বুধবার (২৯ জুলাই) এ অভিযোগ করেন সালমান শাহ।
অভিযোগকারী সালমান শাহ মোহনগঞ্জ উপজেলার সুয়াইর গ্রামের মো. হাসিম উদ্দিনের ছেলে।
অভিযোগে সালমান শাহ উল্লেখ করেন, গত ৩ জুন তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী ফেরদৌস মিয়া তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আশা আক্তারকে মারধরের একপর্যায়ে তলপেটে লাথি মারেন। ওই সময় আশা আক্তার তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। আঘাতের পর রক্তক্ষরণ শুরু হলে তাকে মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন এবং আলট্রাসনোগ্রাফি করতে বলেন। সেদিনই পাশের একটি ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে করা আলট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্টে আশা আক্তারের তিন মাসের গর্ভধারণ এবং ভ্রূণ জীবিত থাকার বিষয়টি উল্লেখ ছিল বলে অভিযোগে বলা হয়। তবে পরদিন ৪ জুন অপর একটি ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে করা আলট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্টে ‘নরমাল স্টাডি’ উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে গেছে।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত ফেরদৌস মিয়ার বিরুদ্ধে মোহনগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করা হলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে ৫ জুন আশা আক্তারকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ছাড়পত্র দিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহনগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) জয় পাল মেডিকেল রিপোর্টের জন্য স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে লিখিত আবেদন করেন। ২৮ জুন তদন্ত কর্মকর্তার কাছে রিপোর্ট দেওয়ার কথা থাকলেও একদিন আগে ২৭ জুন সেটি আদালতে পাঠানো হয়। পরে তদন্ত কর্মকর্তাকে একটি কপি দেওয়া হয়।
সালমান শাহর দাবি, ওই মেডিকেল রিপোর্টে আঘাতের কারণে গর্ভপাতের বিষয়ে আলট্রাসনোগ্রাফির কোনো তথ্য উল্লেখ ছিল না। বরং সেখানে শুধু পায়ে ঘষা লাগার কথা উল্লেখ করা হয়। ওই রিপোর্ট আদালতে জমা দেওয়ার পর ২৮ জুন মামলার আসামি ফেরদৌস মিয়া জামিন পান।
অভিযোগে বলা হয়েছে, পরে বিষয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে জানানো হলে গত ২ জুলাই আশা আক্তারকে নতুন একটি মেডিকেল রিপোর্ট দেওয়া হয়। সে সময় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ আগের রিপোর্টটিকে ভুয়া বলে দাবি করেন এবং তাতে থাকা চিকিৎসকদের স্বাক্ষরও নকল বলে জানান।
সালমান শাহ অভিযোগে প্রশ্ন তোলেন, যদি আগের রিপোর্টটি ভুয়া হয়ে থাকে, তবে সেটি কীভাবে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে আদালত ও তদন্ত কর্মকর্তার কাছে পৌঁছাল। তিনি বলেন, এ ঘটনায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং সরকারি হাসপাতালের মেডিকেল রিপোর্টের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়েছে।

তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) অলক কান্তি তালুকদার বলেন, প্রথম মেকিকেল রিপোর্টটা আমি দেখেছি। ওই রিপোর্টে আমার স্বাক্ষরসহ আরও দুজন মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর নকল করে বসানো হয়েছে। তবে ওই রিপোর্টে আমি কোনো স্বাক্ষর করিনি। বিষয়টি তদন্ত হওয়া দরকার বলে মনে করি।
ভুয়া রিপোর্টে স্বাক্ষর থাকা অপর দুই মেডিকেল অফিসার পার্থ সেন ও মোস্তাফিজুর রহমান জানান, তাদের স্বাক্ষর নকল করা হয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোমেনুল ইসলাম বলেন, নিয়মানুযায়ী মেডিকেল রিপোর্ট আমি দেব এবং এ বিষয়ে রেজিস্ট্রারে এন্ট্রি থাকবে। কিন্তু প্রথম রিপোর্টের বিষয়ে আমার রেজিস্ট্রারে কোনো তথ্য নেই। ২ জুলাই যথাযথ নিয়মে মেডিকেল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। তবে আগের রিপোর্টটি দেখেছি, এটি ভুয়া।
এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডা. গোলাম মাওলা বলেন, অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিনিধি/টিবি




