একসময় ছিল পরিচয়হীন জীবন, নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চনা আর অনিশ্চয়তার অন্ধকার। আজ সেখানে পাকা রাস্তা, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, চিকিৎসা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের পূর্ণ স্বীকৃতি। ২০১৫ সালের ১ আগস্ট ভারত-বাংলাদেশ স্থলসীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ১১ বছর পর পঞ্চগড়ের বিলুপ্ত ৩৬টি ছিটমহলের চিত্র আমূল বদলে গেছে। তবে উন্নয়নের এ গল্পের পাশাপাশি কিছু অপূর্ণতার কথাও বলছেন স্থানীয়রা।
পঞ্চগড়ের অধুনালুপ্ত গাড়াতি ছিটমহল, বর্তমান রাজমহলের বাসিন্দা বিল্লাল হোসেন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে গ্রামের পাকা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অতীতের স্মৃতিচারণ করেন।
তিনি বলেন, একসময় এই পথ ছিল কাঁদামাখা। এখন আর আমাদের কোনো দুঃখ নেই। এলাকা অনেক উন্নত হয়েছে, মনে হয় শহরে আছি। সবই পেয়েছি আমরা। বিল্লাল হোসেনের এই কথাই যেন তুলে ধরে ছিটমহলের বদলে যাওয়ার বাস্তব চিত্র।
একসময় ছিটমহলের বাসিন্দারা ছিলেন রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও নাগরিক অধিকারবঞ্চিত। সন্তানদের অন্যের পরিচয়ে বাংলাদেশে স্কুলে ভর্তি করাতে হতো, চিকিৎসা নিতে হতো ভিন্ন পরিচয়ে। ছিল না কোনো কার্যকর বিচারব্যবস্থা কিংবা সরকারি সেবা। দীর্ঘ ৬৮ বছর এমন বঞ্চনার জীবন কাটানোর পর ২০১৫ সালের ১ আগস্ট স্থলসীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে মুক্তি মেলে তাদের। পঞ্চগড়ের ৩৬টি ছিটমহল বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং বাসিন্দারা পান বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি।

এরপর সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় এসব এলাকায় নির্মিত হয় রাস্তা, ব্রিজ-কালভার্ট, বিদ্যুৎ সংযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির, কমিউনিটি ক্লিনিক, কমিউনিটি সেন্টার, হাট-বাজারসহ নানা অবকাঠামো। পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র, ভোটাধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা, কৃষি প্রণোদনা, স্যানিটেশন ও সরকারি ঘরের সুবিধাও পান বাসিন্দারা।
বর্তমানে ছিটমহলের শিক্ষার্থীরা নিজেদের পরিচয়ে বাড়ির কাছের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছেন। অনেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন, আবার কেউ কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশেও যাচ্ছেন। এক সময়ের বঞ্চনার জনপদ এখন অনেকটাই স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে।
তবে উন্নয়নের এই ধারার মধ্যেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প আজও অপূর্ণ থেকে গেছে। বিলুপ্ত গাড়াতি ছিটমহলে তরুণদের তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণের জন্য কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ডি-সেট (D-SET) সেন্টার দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত। এছাড়া নির্মাণ শেষ হলেও চালু হয়নি একটি হাট, একটি পোস্ট অফিস এবং একটি কমিউনিটি সেন্টার। পুলিশ ফাঁড়ি নির্মাণের উদ্যোগও প্রাচীর নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
অধুনালুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দা শামসুদ্দীন বলেন, আমরা কতটা নির্যাতন ও অসহায় জীবন কাটিয়েছি, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এখন সব ধরনের নাগরিক সুবিধা পাচ্ছি। তবে যারা ভারতে চলে গেছেন, তারা প্রত্যাশিত সুযোগ-সুবিধা পাননি বলে জানতে পারছি।
আরেক বাসিন্দা বিজয় চন্দ্র রায় বলেন, “ছিটমহল বিনিময়ের সময় দেশ বেছে নেওয়ার সুযোগ ছিল। আমি জন্মভূমি ছেড়ে যাইনি। আমার এক ভাতিজা ভারতে গেছে, কিন্তু তারা ভালো নেই।
শিক্ষার্থী আমেনা খাতুন বলেন, আগে আমাদের বড় ভাই-বোনেরা নিজেদের পরিচয়ে পড়তে পারতেন না। এখন আমরা নিজের পরিচয়ে পড়াশোনা করছি, উপবৃত্তি ও শিক্ষা উপকরণও পাচ্ছি।
বাসিন্দা জোসনা বেগম বলেন, নাগরিকত্ব পাওয়ার পর সরকার আমাদের ঘর দিয়েছে, বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। আমরা চাই সরকার ভবিষ্যতেও আমাদের পাশে থাকুক।

ছিটমহল আন্দোলনের নেতা ও কলেজ শিক্ষক মাহাবুব হোসেন বলেন, ডি-সেট সেন্টার, হাট, পোস্ট অফিস ও কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ হলেও সেগুলো চালু হয়নি। পুলিশ ফাঁড়ির কাজও অসম্পূর্ণ। এসব দ্রুত চালু হলে এলাকার মানুষ আরও বেশি উপকৃত হবেন।
এ বিষয়ে পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক শুকরিয়া পারভীন বলেন, আমরা সরেজমিনে বিলুপ্ত ছিটমহল পরিদর্শন করে এখনো যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো দ্রুত সমাধানে উদ্যোগ নেব। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, বর্তমানে এসব এলাকার মানুষ প্রায় সব ধরনের নাগরিক সুবিধা ভোগ করছেন।
প্রতিনিধি/এআরএম




