গ্রামের মাটির মাঠে ফুটবল খেলতে খেলতেই দৌড়ানোর গতি নজরে পড়েছিল শিক্ষকদের। সেই গতি একসময় তাকে নিয়ে যায় উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় প্রতিযোগিতায়। এরপর জাতীয় পর্যায়ে। অবশেষে দেশের দ্রুততম মানবের খেতাব জিতে নিজের নাম লেখালেন বাংলাদেশের অ্যাথলেটিকসের নতুন সম্ভাবনা হিসেবে।
সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার তারালী ইউনিয়নের কাকশিয়ালি গ্রামের জাকির হোসেন এখন স্থানীয় মানুষের গর্ব, জেলার নতুন ক্রীড়া আইকন।
সোমবার বিকালে ঢাকার কমলাপুর স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬’-এর জাতীয় পর্যায়ের অ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতায় ১০০ মিটার স্প্রিন্টে প্রথম হয়ে দ্রুততম মানব হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি।
জাকির কালীগঞ্জ উপজেলার কাকশিয়ালি গ্রামের মাহবুবুর রহমানের ছেলে। উপজেলা, জেলা ও খুলনা বিভাগীয় পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর জাতীয় পর্যায়েও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখে দেশের সেরা স্প্রিন্টারের স্বীকৃতি পেয়েছেন।
প্রতিযোগিতা শেষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। জাকিরের গলায় পরিয়ে দেওয়া হয় স্বর্ণপদক। পাশাপাশি তিনি পান ক্রেস্ট ও নগদ অর্থ।
জাকির বলেন, শুরুতে তিনি ফুটবল খেলতেন। পরে শিক্ষকদের উৎসাহ ও নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে অ্যাথলেটিকসে যুক্ত হন।
তিনি বলেন, উপজেলা থেকে জেলা, জেলা থেকে বিভাগ, এভাবে ধাপে ধাপে জাতীয় পর্যায়ে উঠেছি। যখন জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হলাম, তখন নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। মোমেন স্যার, বাচ্চু স্যার, শাহিন স্যারসহ সবাই আমাকে নিয়মিত অনুশীলন করিয়েছেন। তাদের কারণেই আজকের এই অবস্থানে আসতে পেরেছি।
জাকিরের স্বপ্ন, ভালো পারফরম্যান্স করে একদিন বিকেএসপি কিংবা জাতীয় ক্যাম্পে সুযোগ পাওয়া। এরপর দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিনিধিত্ব করা।
জাকিরের বাবা মাহবুবুর রহমান কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত। তিনি বলেন, ছেলের খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই। আমরা যতটুকু পেরেছি তাকে সহযোগিতা করেছি। এখন চাই, সে দেশের বাইরেও বাংলাদেশের জন্য সম্মান বয়ে আনুক।
চাচা মো. রিপন বলেন, জাকিরের এই অর্জনে শুধু আমাদের পরিবার নয়, পুরো গ্রাম আনন্দিত। কঠোর পরিশ্রম আর নিজের ওপর বিশ্বাসই তাকে এই জায়গায় এনেছে। আমরা চাই সে আরও অনেক দূর যাক।
৯০ ছুঁইছুঁই বয়সেও নাতির সাফল্যে আবেগাপ্লুত দাদা আব্দুল্লাহ বলেন, আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। সবাই ওর জন্য দোয়া করবেন, যেন আরও বড় হতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা ইশারত আলী বলেন, সাতক্ষীরা ক্রিকেট, ফুটবলসহ নানা খেলায় দেশের কাছে পরিচিত। মোস্তাফিজুর রহমান, সৌম্য সরকার, সাবিনা খাতুনদের পর এবার অ্যাথলেটিকসেও জাকির প্রমাণ করল, সাতক্ষীরা পিছিয়ে নেই।
স্থানীয় সাংবাদিক হাফিজুর রহমান শিমুল বলেন, সুন্দরবনের জেলা সাতক্ষীরা শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, ক্রীড়াঙ্গনেও ধারাবাহিকভাবে দেশের সেরা প্রতিভা উপহার দিয়ে আসছে। কালীগঞ্জের সন্তান মোস্তাফিজুর রহমান যেমন বিশ্ব ক্রিকেটে পরিচিত, তেমনি জাকিরের এই অর্জন প্রমাণ করল- সুযোগ পেলে গ্রামের ছেলেরাও জাতীয় পর্যায়ে সেরার মুকুট জিততে পারে।
স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠকদের মতে, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে সাতক্ষীরার মতো জেলা থেকে আরও অনেক জাকির উঠে আসবে। আর জাকিরের এই সাফল্য এখন গ্রামের অসংখ্য কিশোর-কিশোরীর কাছে নতুন স্বপ্নের নাম, গ্রামের মাঠ থেকে দেশের দ্রুততম মানব হওয়ার স্বপ্ন।
প্রতিনিধি/এলএ




