বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬, ঢাকা

৩৪ বছরের ‘ছোট্ট’ মিলি

জামাল হোসেন বাপ্পা, বাগেরহাট
প্রকাশিত: ৩০ জুলাই ২০২৬, ১০:৪০ এএম

শেয়ার করুন:

৩৪ বছরে ২৮ ইঞ্চির উচ্চতা, ছোট্ট মিলির দুনিয়ার বড় স্বপ্ন
মিলি আক্তার

বয়সের হিসেবে তিনি প্রাপ্তবয়স্ক, কিন্তু শারীরিক গড়ন এক ছোট্ট শিশুর মতো। উচ্চতা মাত্র ২৮ ইঞ্চি বা ২ ফুট ৪ ইঞ্চি। জীবনের ৩৪টি বসন্ত পেরিয়ে গেলেও তার শরীরের উচ্চতা আর বাড়েনি। এখনও বাচ্চাদের মতো তার খেলার সাথী জুসের খালি বোতল আর প্লাস্টিকের কিছু হাড়ি-পাতিল। ছোট্ট শরীরের এই মানুষটির বড় কোনো চাওয়া নেই—দামি খেলনা বা বিলাসী জীবন নয়, তার চাওয়া কেবল একটি ঘর, একটি গরু আর একটি ছাগল। এই সামান্য চাওয়াগুলোই যেন তার কাছে বিশাল এক পৃথিবী।

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম গুলিশাখালী গ্রামের মিলি আক্তারের জীবন যেন অভাব, বঞ্চনা আর অপূর্ণতার দীর্ঘ এক গল্প। ১৯৯২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া মিলির বয়স এখন ৩৪ বছর। পরিবারের দাবি, হরমোনজনিত জটিলতার কারণে জন্মের পর থেকে মিলির শারীরিক উচ্চতা স্বাভাবিকভাবে বাড়েনি।

মিলির জন্মের আগেই ভেঙে যায় তার মায়ের সংসার। তখন তিনি মায়ের গর্ভে। বাবা নজরুল ইসলাম স্ত্রী-সন্তানকে ছেড়ে চলে যান, আর কখনো ফিরে আসেননি। দুই বছর বয়সে মিলিকে নানা-নানির কাছে রেখে জীবিকার তাগিদে সৌদি আরবে পাড়ি জমান মা ফরিদা ইয়াসমিন। দীর্ঘ ২৭ বছর পর দেশে ফিরে তিনি দেখেন, মেয়ের বয়স বেড়েছে, কিন্তু উচ্চতা বাড়েনি একটুও।

মায়ের ফিরে আসার পর মিলির ছোট্ট পৃথিবীটা একটু পূর্ণতা পেলেও জীবন সহজ হয়নি। সংসারে অভাব, মায়ের অসুস্থতা, ভাইয়ের পড়াশোনা—সব মিলিয়ে প্রতিনিয়ত চলেছে টানাপোড়েন।

শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও নিজের দৈনন্দিন কাজগুলো মিলি নিজেই করার চেষ্টা করেন। রাত ১১টার দিকে পরিবারের অন্যদের সঙ্গে ঘুমাতে যান। সকালে উঠে নিজেই দাঁত ব্রাশ করেন, গোসল করেন। দিনের বেশির ভাগ সময় ছোট ভাইয়ের আশপাশেই কাটান। বৃদ্ধ ও অসুস্থ মায়ের প্রতি তার গভীর মায়া রয়েছে; সময়-অসময়ে মাকে বিরক্ত করেন না। তবে নিজের পছন্দের কিছু না হলে কিংবা ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু ঘটলে তিনি অভিমান করেন, কখনো রেগেও যান।

মিলির আছে শৈশবের মতো কিছু সরল আনন্দ। মুঠোফোনে গেম খেলতে ভালোবাসেন, গান শুনতে পছন্দ করেন, সুযোগ পেলে নাচেনও। মাছ-মাংস, পিঠা, আপেল আর কমলা তার প্রিয় খাবার।

মিলির মা ফরিদা ইয়াসমিনের জীবনও সংগ্রামে ভরা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, মিলিকে গর্ভে রেখে আর সাড়ে তিন বছরের বড় মেয়ে পলি আক্তারকে রেখে ওর বাবা চলে যায়। আজ পর্যন্ত ফিরে আসেনি। অনেক কষ্ট করে বড় মেয়েকে লেখাপড়া করিয়েছি, বিয়ে দিয়েছি। কিন্তু মিলিকে জন্মের পর ভালো চিকিৎসা কিংবা পুষ্টিকর খাবার দিতে পারিনি।

Capture4

জীবনের প্রয়োজনে পরে আবার বিয়ে করেন ফরিদা ইয়াসমিন। দুই মেয়েকে নিয়ে চলে যান সিলেটের গোয়াইনঘাটা উপজেলায় বর্তমান স্বামীর বাড়িতে। কিন্তু সেখানেও স্থায়ীভাবে বসবাস করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত স্বামীকে নিয়ে ফিরে আসেন নিজের জন্মভূমি বাগেরহাটে।

বর্তমানে ৪২ শতক জমির ওপর বসতভিটাটুকুই পরিবারটির একমাত্র সম্বল। ফরিদা ইয়াসমিনের দ্বিতীয় স্বামী দিন মজুর সংসারে কলেজ পড়ুয়া এক ছেলে রয়েছে। অর্থের অভাবে তার পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে। একদিকে অসুস্থ বৃদ্ধ মা, অন্যদিকে শারীরিকভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মেয়ের ভবিষ্যৎ—সব মিলিয়ে জীবনের প্রতিটি দিনই যেন নতুন এক সংগ্রাম।

মিলির মা মোসা ফরিদা ইয়াসমিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সরকারি সাহায্য বলতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিবন্ধী কার্ডই আমাদের একমাত্র ভরসা। মেয়ের গরু আর ছাগল পালনের শখ এখনো পূরণ করতে পারিনি। আমরা প্রত্যন্ত গ্রামে থাকি, তাই কোথায় গেলে কী সহযোগিতা পাওয়া যায় তাও জানি না। আমি বেঁচে থাকতে মেয়ের জন্য তিনবেলা দুমুঠো খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করে যেতে পারলেই শান্তি পেতাম।

Capture2

মিলির বড় বোনের স্কুলপড়ুয়া ছেলে মো. রাহাত জানায়, ছোটবেলা থেকেই আমরা একসঙ্গে থাকি। মিলি আমাকে মাঝে মাঝে প্রশ্ন করে—‘তুমি বড় হও, কিন্তু আমি বড় হই না কেন?

 

মোরেলগঞ্জ উপজেলা প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা মো. কায়কোবাদ জানান, মিলির চলাচলে অসুবিধা হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করা হবে। এ ছাড়া জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন থেকে কোনো আর্থিক সহযোগিতা এলে তা তাকে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, মিলি বর্তমানে প্রতিবন্ধী হিসেবে ভাতা পাচ্ছেন। এ ছাড়াও উপজেলায় সরকারি যেসকল সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, তার আওতায় মিলিকে আনা হবে।

প্রতিনিধি/টিবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর