বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ঢাকা

‘আমার মেয়েটারে দেখে রাখবেন’, আত্মহত্যার আগে শামিমের ভিডিও বার্তা

জেলা প্রতিনিধি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশিত: ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৯ পিএম

শেয়ার করুন:

‘আমার মেয়েটারে দেখে রাখবেন’,  আত্মহত্যার আগে শামিমের ভিডিও বার্তা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় ঋণের কিস্তির চাপে মো. শামিম মিয়া (৪৫) নামে এক ব্যবসায়ী আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মৃত্যুর আগে তিনি একটি আবেগঘন ভিডিও বার্তা রেখে যান। ওই ভিডিওতে তিনি স্বজনদের উদ্দেশে নিজের মেয়ের দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, তিনি আর কোনো উপায় না পেয়ে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ভিডিও বার্তায় শামিম মিয়া বলেন, ‘আমার মেয়েটারে হামিদ ভাই, আপা, আমার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-স্বজনের কাছে তুলে দিয়ে গেলাম। আমার মেয়েটারে দেখে রাখবেন। আপনার একটা মেয়ে আছে হামিদ ভাই, আপনার মেয়ের মতো আমার মেয়েটাকেও দেখবেন। আমি কোনো উপায় বুদ্ধি না পাইয়া এই কাজ করছি। আমার মেয়েটারে দেখে রাখবেন। আমার মেয়েটারে বিয়ে দেওয়ার আগ পর্যন্ত আপনাদের হাতে তুলে দিয়ে গেলাম।’

বুধবার (২৯ জুলাই) সন্ধ্যায় ময়নাতদন্ত শেষে নিহতের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এর আগে, মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। একই দিন সকালে নিজ বাড়িতে কীটনাশক পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।

নিহত শামিম মিয়া আখাউড়া দক্ষিণ ইউনিয়নের বড় কুড়িপাইকা গ্রামের জম্মদার বাড়ি এলাকার মৃত দারু মিয়ার ছেলে। তিনি সবজি ও ডিমের  ব্যবসা করতেন। তবে দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার কারণে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়।

হাসপাতাল ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত শামিমের বড় ছেলে জাহিদকে ইরাকে পাঠানোর জন্য প্রায় ২২ থেকে ২৫ লাখ টাকা সাতটি বেসরকারি এনজিও থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৭ লাখ টাকা পরিশোধ করা হলেও এখনও ১৬ থেকে ১৮ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। প্রতি মাসে প্রায় দেড় লাখ টাকা কিস্তি পরিশোধ করতে হতো। এই কিস্তির চাপ সহ্য করতে না পেরে গত মঙ্গলবার সকালে কীটনাশক পান করেন শামিম মিয়া। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে প্রথমে আখাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা ও স্টোমাক ওয়াশ করার পর দুপুর ১২টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে মেডিসিন ওয়ার্ডে তার মৃত্যু হয়।

শামিম মিয়ার ছেলে ইমন মিয়া প্রকাশ সিয়াম জানান, প্রায় সাত মাস আগে বড় ভাই জাহিদকে বিদেশ পাঠানোর জন্য ব্র্যাক, শক্তি, সেতু, পল্লি মঙ্গল, পদক্ষেপ, আশা ও টিএসসহ বেশকয়েকটি বেসরকারি এনজিও থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছিল। প্রথমদিকে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করা হলেও পরে আর দেওয়া সম্ভব হয়নি।

তার অভিযোগ, কিস্তির টাকা আদায়ের জন্য প্রায়ই এনজিও কর্মীরা বাড়িতে এসে চাপ সৃষ্টি করতেন এবং সময়মতো টাকা দিতে না পারলে দুর্ব্যবহার করতেন। ঘটনার আগের দিনও কিস্তির টাকার জন্য বাড়িতে এসে তার বাবার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হয়। এরপর থেকেই তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং পরদিন সকালে সবার অগোচরে বিষপান করেন।

ইমন আরও দাবি করেন, তার বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করার পরও এনজিওর লোকজন তার মায়ের কাছে কিস্তির টাকা দাবি করেন। পরে বুধবার সকালে একটি এনজিওর প্রতিনিধি এসে তার মায়ের কাছ থেকে একটি কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে জানিয়ে যান যে, আর কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না।

তবে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এনজিওগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

আখাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাবেদ উল ইসলাম বলেন, একজন ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছেন। মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে কিস্তির চাপের অভিযোগ করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রতিনিধি/ এজে

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর