রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

কম্পিউটার নেই, মায়ের স্মার্টফোনেই অ্যাপ বানায় যমজ ২ ভাই

মো. আল-আমিন, শরীয়তপুর
প্রকাশিত: ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম

শেয়ার করুন:

কম্পিউটার নেই, মায়ের স্মার্টফোনেই অ্যাপ বানায় যমজ ২ ভাই
স্মার্টফোনে অ্যাপ বানিয়ে আলোচনায় আসা শরিয়তপুরের যমজ দুই ভাই তাফসির ও তানভীর

এক হাতে মায়ের পুরনো স্মার্টফোন, অন্য হাতে অদম্য কৌতূহল—এই দুই সম্বল নিয়েই প্রযুক্তির জগতে নিজেদের জায়গা তৈরি করছে শরীয়তপুরের দুই ক্ষুদে শিক্ষার্থী। যেখানে অনেক শিশুর শেখার মাধ্যম কম্পিউটার ও আধুনিক ডিভাইস, সেখানে মাত্র একটি মোবাইল ফোনে ইউটিউব দেখে অ্যাপ তৈরি শিখেছে তারা। ইতোমধ্যে তৈরি করেছে ই-কমার্স অ্যাপ, মেসেজিং অ্যাপ এবং নানা ধরনের ছোট বৈদ্যুতিক যন্ত্র। তবে প্রতিভার এই পথচলায় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আর্থিক সংকট।

শরীয়তপুর সদর উপজেলার কাশাভোগ এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক ও জান্নাতুল ফেরদৌস দম্পতির তিন সন্তান হাবিবা ইসলাম (১২), তাফসির ও তানভীর (১১)। তাফসির ও তানভীর যমজ। সীমিত আয়ের এই পরিবারে বড় কোনো প্রযুক্তি সুবিধা না থাকলেও সন্তানদের শেখার আগ্রহ থেমে থাকেনি। বাবার সামান্য আয়ের সঙ্গে মায়ের সেলাইয়ের কাজের উপার্জন দিয়েই চলছে সংসার ও সন্তানদের পড়াশোনা। 

সম্প্রতি ধানুকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক বৃত্তি অর্জন করে তিন ভাই-বোনই আঙ্গারিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ ছিল তাফসির ও তানভীরের। কিন্তু পরিবারের পক্ষে কম্পিউটার কেনা সম্ভব হয়নি। তাই মায়ের স্মার্টফোনে ইউটিউব দেখে নিজেরাই শুরু করে অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট শেখা। 

প্রযুক্তির প্রতি ভালোবাসা আর শেখার আগ্রহ থেকে ইতোমধ্যে তারা তৈরি করেছে তিনটি ই-কমার্স অ্যাপ ও একটি মেসেজিং অ্যাপ। তাদের তৈরি অ্যাপের মাধ্যমে পণ্য কেনাবেচার পাশাপাশি যোগাযোগের সুবিধাও রাখা হয়েছে। শুধু সফটওয়্যার নয়, নিজেদের সৃজনশীলতায় তৈরি করেছে ছোট ছোট বৈদ্যুতিক যন্ত্রও। 

তাফসির জানায়, আমরা ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। মায়ের মোবাইল ফোনে ইউটিউব দেখে অ্যাপ তৈরি শেখা শুরু করি। এরপর ধীরে ধীরে নিজেরাই তিনটি ই-কমার্স অ্যাপ এবং কথা বলার একটি অ্যাপ তৈরি করেছি। আমাদের তৈরি অ্যাপে পণ্য কেনা-বেচার সুযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে চাই। 

তানভীর জানায়, অ্যাপ তৈরির পাশাপাশি আমরা বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রও বানিয়েছি। ফেলনা টিন, মটরসহ বিভিন্ন জিনিস ব্যবহার করে ব্লেন্ডার মেশিন ও সেচযন্ত্র তৈরি করেছি। তবে উন্নত যন্ত্রপাতি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ডিভাইস আমাদের এলাকায় পাওয়া যায় না, আর কিনতে গেলে অনেক খরচ হয়। ভবিষ্যতে আমরা এমন রোবট তৈরি করতে চাই, যা মানুষের কথা বুঝতে পারবে এবং প্রতিবন্ধী ও অসুস্থ মানুষের কাজে সহযোগিতা করবে। 

সে আরও জানায়, আমাদের স্বপ্ন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হওয়া। নতুন নতুন প্রযুক্তি তৈরি করে দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। কিন্তু কম্পিউটার ও প্রশিক্ষণের সুযোগ না থাকায় অনেক সময় সমস্যায় পড়তে হয়। 

অন্যদিকে বড় বোন হাবিবা ইসলামও পড়াশোনার পাশাপাশি সৃজনশীল কাজে আগ্রহী। আঁকাআঁকি ও সেলাইয়ে দক্ষ হাবিবা নিয়মিত মাকে সহযোগিতা করে। ভবিষ্যতে একজন চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করার স্বপ্ন তার। 

হাবিবা বলে, আমরা তিন ভাই-বোন একসঙ্গে বৃত্তি পেয়েছি। আমার দুই ভাই প্রযুক্তি নিয়ে অনেক কাজ করে। তারা মোবাইল দিয়ে যেসব অ্যাপ তৈরি করেছে, তা দেখে আমার ভালো লাগে। আমি ভবিষ্যতে একজন ডাক্তার হয়ে মানুষের পাশে থাকতে চাই। 

সন্তানদের প্রতিভায় গর্বিত বাবা আব্দুর রাজ্জাক। তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের জন্য একটি কম্পিউটার কিনে দিতে না পারার কষ্ট রয়েছে তার। 

আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে চাকরি করি। এই আয় দিয়ে সংসার ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাই। আমার সন্তানরা অনেক মেধাবী। তারা যদি একটি কম্পিউটার ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের সুযোগ পেত, তাহলে আরও ভালো কিছু করতে পারত।

মা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, আমার সন্তানদের শেখার আগ্রহ অনেক বেশি। তারা কোডিং শিখতে চায়, ফ্রিল্যান্সিং শিখতে চায়। কিন্তু আমাদের আর্থিক সমস্যার কারণে তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দিতে পারছি না। সুযোগ পেলে তারা আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে। 

ধানুকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক শিবুনাথ গোস্বামী বলেন, হাবিবা, তাফসির ও তানভীর অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী। ছোট থেকেই তাদের প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ রয়েছে। নিজেদের চেষ্টায় তারা অ্যাপ তৈরি করছে। সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠান যদি তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসে, তাহলে তারা ভবিষ্যতে দেশের জন্য বড় অবদান রাখতে পারবে। 

একটি স্মার্টফোন থেকে শুরু হওয়া এই তিন শিশুর প্রযুক্তি যাত্রা এখন বড় স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রয়োজন শুধু একটু সহযোগিতা ও সুযোগের—যা পেলে শরীয়তপুরের এই খুদে প্রযুক্তিবিদরা ভবিষ্যতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।

এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর