দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা নোয়াখালীর হাতিয়া। ২ হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই জনপদে প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষের বসবাস। মেঘনা নদী এবং বঙ্গোপসাগরের অথৈ জলরাশিতে ঘেরা এই দ্বীপবাসীর মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌপথ। দীর্ঘকাল ধরে এখানকার মানুষ চরম ঝুঁকি নিয়ে ট্রলার, নৌকা এবং স্পিডবোটে নদী পারাপার হয়ে আসছিলেন।
সেই কষ্টের অবসান ঘটিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে বহুল প্রতীক্ষিত চেয়ারম্যান ঘাট-নলচিরা রুটে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরি সার্ভিস চালু হয়। এর ফলে এই অঞ্চলের মানুষের যাতায়াতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খোলে। তবে ফেরি সার্ভিস চালু হলেও অপরিকল্পিত ফেরিঘাট নির্মাণ এবং সংযোগ সড়কের বেহাল দশার কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন যাত্রীরা। সামান্য জোয়ারের পানিতেই পুরো ঘাট এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় নিত্যদিন চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এই রুটে চলাচলকারীদের।
সরেজমিনে ঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ফেরিতে ওঠার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট বা আলাদা টেকসই সড়ক নেই। জোয়ার এলেই ঘাটের মূল রাস্তাটি পানিতে তলিয়ে যায় এবং সেখানে তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। ফলে যাত্রীদের এক কোমর পানি মাড়িয়ে ফেরিতে উঠতে ও নামতে হচ্ছে। এতে নারী, শিশু ও বয়োবৃদ্ধদের কষ্ট বহুগুণ বেড়ে গেছে।
হাতিয়া পৌরসভার ওসখালি এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ফেরি চালু হওয়ায় ভাবছিলাম আমাদের দুর্ভোগ শেষ। কিন্তু এখন দেখছি দুর্ভোগের রূপ বদলেছে মাত্র। জোয়ার আসলেই ঘাটের রাস্তা পানিতে ডুবে যায়। আজকেও পরিবার নিয়ে এক কোমর পানি পার হয়ে ফেরিতে উঠতে হয়েছে। ছোট বাচ্চাটা ভিজে একাকার, সঙ্গে থাকা মালামালও নষ্ট হয়ে গেছে। এইটা কোনো আধুনিক ফেরিঘাট হতে পারে না।
একই ঘাটে ঢাকাগামী নারী যাত্রী রাবেয়া খাতুন বলেন, আমাদের মতো নারীদের জন্য এই ঘাটে চলাচল করা এখন নরকযন্ত্রণার মতো। কাপড়ে কাদা-পানি মেখে, ভিজে কাপড়ে ফেরিতে বসে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এখানে দ্রুত একটা উঁচু প্ল্যাটফর্ম বা টেকসই জেটি করা দরকার।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী গাড়ির চালকেরা। ঘাটে সুনির্দিষ্ট পার্কিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিন দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা চালকদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। জোয়ারের তীব্র স্রোত ও পানির ওপর দিয়েই অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে গাড়িগুলোকে ফেরিতে ওঠাতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম থেকে মালবাহী ট্রাক নিয়ে আসা চালক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, জোয়ারের পানির তলায় রাস্তা দেখা যায় না। আন্দাজের ওপর গাড়ি চালাতে হয়। যেকোনো সময় চাকা গর্তে পড়ে গাড়ি উল্টায়ে মেঘনায় চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাছাড়া নোনা পানিতে গাড়ির ইঞ্জিন ও বডি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ঘাট আর রাস্তাটা যদি আর ৫-৬ ফুট উঁচু করে করা হতো, তবে আমাদের এই জীবনঝুঁকি থাকতো না।

যাত্রী দুর্ভোগের পাশাপাশি এই রুটে রয়েছে আরও এক বড় সংকট। উপকূলীয় জেলা নোয়াখালীর এই হাতিয়া অঞ্চলে প্রতিবছর অন্তত দুই থেকে তিনবার শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানে। কিন্তু দুর্যোগের এই দিনগুলোতে ফেরিগুলোকে সুরক্ষিত রাখার জন্য হাতিয়ায় কোনো ‘নিরাপদ জোন’ বা প্রটেকশন এরিয়া নেই। এর ফলে দুর্যোগের সময় ফেরিগুলো মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ে এবং যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
এই বিষয়ে মহানন্দা ফেরি’র মাস্টার মোজাম্মেল হোসেন জানান, জোয়ার-ভাটার তীব্র সংকট থেকে যাত্রীদের রক্ষা করতে হলে এখানে অবিলম্বে একটি ‘হাই ওয়াটার ঘাট’ (উঁচু ঘাট) নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি। একটি হাই ওয়াটার ঘাট থাকলে জোয়ারের সময়ও মানুষ কোমর পানি না মাড়িয়ে অনায়াসে যাতায়াত করতে পারবে।
তিনি আরও বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ফেরিগুলো নোঙর করে রাখার মতো কোনো নিরাপদ পকেট বা ক্রিক (খাঁড়ি) এখানে নেই, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
যোগাযোগ ব্যবস্থার এই বেহাল দশা ও আধুনিকায়নের দাবি প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) স্থানীয় কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন বলেন, যাত্রী এবং চালকদের দুর্ভোগের বিষয়টি আমরা জানি। জোয়ারের সময় পানি ওঠার কারণে সাময়িক সমস্যা হচ্ছে। আমরা ইতোমধ্যে বিআইডব্লিউটিএ এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগকে ঘাটটি উঁচু করা এবং সংযোগ সড়ক টেকসই করার জন্য চিঠি দিয়েছি। আশা করছি, দ্রুতই এর একটি স্থায়ী সমাধান হবে।
প্রতিনিধি/টিবি




