‘বাপু, বাঁধ কি অইবো না?’

নাঈম ইসলাম শেরপুর
প্রকাশিত: ০১ আগস্ট ২০২২, ০৭:৫৯ পিএম
‘বাপু, বাঁধ কি অইবো না?’

পাহাড়ি ঢলে শেরপুরের নালিতাবাড়ী পৌর শহরের উত্তর গড়কান্দা মহল্লায় ভোগাই নদীতে শহর রক্ষা বাঁধে ১১০ মিটারজুড়ে ভাঙনের সৃষ্টি হয়। সময় পেরিয়ে গেলেও ভাঙন অংশ সংস্কার না হওয়ায় ফের পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।

‘বাঁধ ভাইঙ্গা ঘরে পানি উঠছিলো কয়েক দিন আগেই। পরে পুলাপান লইয়াপ্রাইমারি স্কুলের বারান্দায় আছিলাম তিন দিন। ঢল আইলে আমগোর খুব কষ্ট অয় (হয়)। বাপু, বাঁধ কি অইবো না?’ —কথাগুলো এ প্রতিবেদককে বলছিলেন পৌর এলাকার উত্তর গড়কান্দা মহল্লার বাসিন্দা চাতাল শ্রমিক আয়েশা বেগম (৫৮)। 

একইভাবে আক্ষেপ করে আব্বাস উদ্দিন বলেন, ‘ঢল আইলেই ঢড় (ভয়) করে। আবার ঢলের পানি আইলে হয়তো ঘরটাই ভাসায়া নিবো। আর কতো চোখের পানি ফালাইলে এই বান্ধের দেহা পামু? প্রতিটা বছরই ঢলের পানিতে ভাসতে থাকি।’

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বাঁধ সংস্কারের কাজ গত ৩০ জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে কাজটি আটকে রয়েছে। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বলছে পাইলিং ও জিও ব্যাগ প্রস্তুত করা হয়েছে আগেই। সংশ্লিষ্ট দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পেলে ভাঙন অংশে বস্তা ফেলার কাজ শুরু করা হবে। 

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে গত ১৯ জুন ভোগাই নদীতে ঢল নামে । এতে পানির স্রোতে শহরের উত্তর গড়কান্দা এলাকায় নদীর ১০০ মিটার বাঁধ ভেঙে যায়। এই ভাঙন অংশ দিয়ে ঢলের পানি প্রবেশ করে চারটি মহল্লার প্রায় ৭০০ পরিবারের বাড়িঘরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এ সময় বাঁধের সামনে বাগানবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এতে ভুক্তভোগী অনেক পরিবার স্কুলের বারান্দায় এবং নিজ বাড়ি ছেড়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নেন। বাঁধটি সংস্কারে পাউবোর পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১১০ মিটার বাঁধ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৩৮ লাখ টাকা। এ কাজের দায়িত্ব পায় রিফাত এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
BADH SHERPUR2বাঁধ সংস্কারে গত ৪ মে কাজ শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু গত ১৭ জুন ফের পাহাড়ি ঢলে এই ভাঙন অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ করে। এতে উত্তর গড়কান্দা, গড়কান্দা, গুনাপাড়া ও শিমুলতলা মহল্লায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। উত্তর গড়কান্দা এলাকায় ৫০০ মিটার সড়ক পানিতে ডুবে যায়। এছাড়া ৭০০ পরিবারের বাড়িঘরে এবং থাকার ঘরে হাঁটুসমান পানি থাকায় পরিবারের লোকজন দুর্ভোগে পড়েন। নদীতে পানি কমে যাওয়ায় এক দিন পর বাড়িঘর থেকে ঢলের পানি নেমে যায়। কিন্তু বাঁধটি সংস্কার না হওয়ায় ফের পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন এলাকাবাসী ।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাঁধের ভাঙন অংশে নদীতে ১৮৩ টি পাইলিংয়ের স্থলে ১৬০টি গাছের খুঁটি পুঁতে পাইলিং করা হয়েছে। ৪ হাজার ৩৫০টি জিও ব্যাগ ফেলার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন যাবত ব্যাগগুলো পড়ে থাকায় অনেক ব্যাগ নষ্টও হয়ে গেছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো কাজ করছে না। ঈদের আগে কাজ করা হলেও ঈদের পর এখনও কাজ শুরু করা হয়নি।

মানবাধিকার সংস্থা সৃষ্টি হিউম্যান রাইটস সোসাইটির জেলা সভাপতি আলমগীর আল আমিন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা জেনেছি ওই এলাকায় ১১০ মিটার বাঁধ সংস্কার কাজ গত ৩০ জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখনো কাজ শেষ হয়নি। এর খেসারত পোহাত হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। দ্রুত কাজ শেষ করার দাবি জানাচ্ছি। 

রিফাত এন্টাপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ইতিমধ্যে নদীতে পাইলিং করতে বলি (গাছের গুঁড়ি) পোঁতা হয়েছে। ৪ হাজার ৩৫০টি জিও ব্যাগ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পেলে ভাঙন অংশে বস্তা ফেলার কাজ শুরু করা হবে। আশা করছি, ১০-১২ দিনের মধ্যে বাঁধ সংস্কারের নির্মাণকাজ শেষ করা হবে ।

পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী তৌফিকুর রহমান বলেন, ১১০ মিটার বাঁধ সংস্কার কাজ ৩০ জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে কাজটি আটকে রয়েছে। এ ব্যাপারে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে।

প্রতিনিধি/এএ