‘ঋণ শোধ করব কীভাবে, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ যোগাব কীভাবে, ভাত খাব কী? এখন চারদিকে শুধু অন্ধকার দেখি।’ কথাগুলো বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের তালুকদারপাড়া গ্রামের কৃষাণী লিলি প্রু মারমা (৪২)।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সকালে বন্যাকবলিত তালুকদারপাড়া গ্রামে সরেজমিনে তার সঙ্গে কথা হলে এই প্রতিবেদককে তিনি এভাবেই তার দুঃখের কাহিনী বলেন।
রোয়াংছড়ি উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার দূরে দুর্গম তালুকদারপাড়া গ্রামের ৭৪টি পরিবারের প্রধান জীবিকা কৃষি। চারদিকে শসা, বেগুন, করলা, পেঁপে, ধান, ভুট্টাসহ বিভিন্ন সবজির আবাদ। সড়ক যোগাযোগ ভালো হওয়ায় ব্যবসায়ীরা ট্রাকভর্তি করে এখানকার সবজি দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যান। অনেক কৃষক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আগাম টাকা (দাদন) এবং এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় গ্রামের প্রায় সব কৃষিজমি তলিয়ে গিয়ে সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। ঘরবাড়িও পানিতে ডুবে যাওয়ায় গ্রামের অধিকাংশ পরিবার এখন নিঃস্ব।
লিলি প্রু মারমা জানান, ব্র্যাক থেকে ৫০ হাজার এবং শক্তি ফাউন্ডেশন থেকে আরও ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে দেড় একর জমিতে শসার চাষ করেছিলেন। প্রতিবছর সবজি বিক্রির আয় দিয়েই চার সন্তানের লেখাপড়ার খরচ চালাতেন।
তার বড় ছেলে ঢাকায় সাভারের একটি কলেজে এইচএসসি প্রথম বর্ষে, ছোট ছেলে ঢাকার সমরিতা স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে, বড় মেয়ে এবার রাঙ্গামাটির মনোঘর আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে এবং ছোট মেয়ে রাঙ্গামাটি মনোঘর আবাসিক বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে পড়ছে।
লিলি বলেন, ‘চারটা সন্তানকে কীভাবে পড়াব, ঋণ শোধ করব কীভাবে? ভাত খাব কী? দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগে অন্তত দিনমজুরি করে সংসার চালানোর সুযোগ ছিল। এখন সেই সুযোগও নেই। কারণ গ্রামের প্রায় সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কাউকে আর দিনমজুর হিসেবে কাজে নেওয়ার অবস্থাও কারো নেই।
লিলির দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সুদমুক্ত ঋণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হলে অন্তত নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ মিলবে।
তালুকদারপাড়ার ৭৪টি পরিবারের প্রায় সবাই কৃষিনির্ভর। প্রত্যেক পরিবারের কমপক্ষে দুই থেকে ছয় লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন গ্রামের কারবারি মংপু মারমা (৪৮)।
তিনি বলেন, ‘গত বছর দেড় কানি বেগুন, দুই কানি শসা, দেড় কানি ধান ও পেঁপে চাষ করে প্রায় আড়াই লাখ টাকা আয় করেছিলাম। এবার আরও বেশি আবাদ করেছিলাম। আশা ছিল অন্তত ছয় লাখ টাকা আয় হবে। কিন্তু বন্যায় সব শেষ হয়ে গেছে।’
তিনি জানান, পুরো গ্রামের অন্তত ৮০ কানি ধান ও সবজির জমি নষ্ট হয়েছে। এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে।
কৃষক মংনু প্রু মারমা (৪২) জানান, গত বছর এক কানি শসা চাষ করে প্রায় দেড় লাখ টাকা আয় করেছিলেন। এবার তিন কানি জমিতে শসা চাষ করতে ব্র্যাক থেকে ৭০ হাজার, শক্তি ফাউন্ডেশন থেকে ৮০ হাজার এবং ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দাদন হিসেবে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ‘এক টাকাও পরিশোধ করতে পারিনি। এখন ভাবছি পরিবার নিয়ে খাব কী, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ দেব কীভাবে।’ তার মেয়ে চট্টগ্রামের একটি স্কুলে দশম শ্রেণিতে এবং ছেলে ঢাকার সমরিতা স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে।
অপর কৃষক উবাচিং মারমা (৫৪) জানান, গত বছর ৪০ শতক জমিতে শসা চাষ করে এক লাখ ৪৮ হাজার টাকা পেয়েছিলেন। এবার ৮০ শতক জমিতে আবাদ করেছিলেন। আশা ছিল চার লাখ টাকা আয় হবে। কিন্তু বন্যায় সব নষ্ট হয়ে গেছে।
এদিকে লিলি উ (২৩) জানান, ব্র্যাক থেকে ৮০ হাজার, শক্তি ফাউন্ডেশন থেকে ৭০ হাজার, গ্রাম সমিতি থেকে ১০ হাজার এবং ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে দুই কানি শসা ও এক কানি ধানের আবাদ করেছিলেন। সেই ফসলও বন্যায় নষ্ট হয়ে গেছে।
গ্রামবাসী জানান, বন্যার সময় ৭৪টি পরিবারের সব ঘর পানিতে তলিয়ে যায়। তখন সবাই স্থানীয় বৌদ্ধ বিহারে আশ্রয় নেন। পানি নেমে গেলেও ঘরবাড়ি এখনো ভেজা থাকায় অনেক পরিবার বাড়িতে ফিরতে পারেনি। ত্রাণ মিললেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল।
ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতি পরিবারকে পাঁচ কেজি চাল, এক কেজি ডাল, দুটি বিস্কুটের প্যাকেট, একটি সাবান, একটি নাপা ট্যাবলেটের প্যাকেট, একটি গ্যাস লাইটার, এক প্যাকেট লবণ ও এক প্যাকেট মোমবাতি দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের দাবি, ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় এই সহায়তা খুবই অপ্রতুল।
তারাছা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান উনুমং মারমা জানান, তার ইউনিয়নে মোট ৪২৭টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে সরকারি ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। শুক্রবার থেকে প্রতি পরিবারকে ২৩ কেজি করে চাল দেওয়া হবে। ইউনিয়নের জন্য ১৪ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ এসেছে।
তিনি বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার মাধ্যমে সমাজসেবা কার্যালয়ে সুদমুক্ত ঋণের জন্য আবেদন করতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারি সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।’
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আবু নঈম মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন ঢাকা মেইলকে জানান, গত ৬ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত টানা ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে জেলার কৃষিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘২ হাজার ২৯৪ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৭৩২ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। এতে ৮ হাজার ১৬৯ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে গ্রীষ্মকালীন সবজিতে।’
তিনি আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে আগাম শীতকালীন সবজির বীজ ও আমনের বীজ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার মাধ্যমে সমাজসেবা কার্যালয়ে সুদমুক্ত ঋণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। এ ছাড়া ১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত জেলার সাত উপজেলায় কৃষক কার্ড তৈরির কার্যক্রম চলছে। কৃষকরা ভবিষ্যতে সরকারি কৃষি সহায়তা ও প্রণোদনা এই কার্ডের মাধ্যমেই পাবেন।
প্রতিনিধি/এফএ




