বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

মতলবে এতিমদের ৪৬ টন চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ

জেলা প্রতিনিধি, চাঁদপুর
প্রকাশিত: ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৭:০০ পিএম

শেয়ার করুন:

মতলবে এতিমদের ৪৬ টন চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ

চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় এতিমখানাগুলোর জন্য সরকারি বরাদ্দের চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার ৪৬টি এতিমখানার জন্য মোট ৪৬ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হলেও অভিযোগ রয়েছে, এর বড় একটি অংশ প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছেনি। অনেক প্রতিষ্ঠান এক টনের পরিবর্তে মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি চাল পেয়েছে বলে দাবি করেছে। আবার কোথাও চালের পরিবর্তে নগদ অর্থ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে, যা সরকারি নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সরেজমিনে উপজেলার কয়েকটি এতিমখানা ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা জানান, সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী এক টন চাল পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তারা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কম চাল পেয়েছেন।

কলাকান্দি ইউনিয়নের নেদায়ে ইসলাম আশিকে মানযুর (রা.) নুরানী হাফিজিয়া মাদরাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, এক টন চালের পরিবর্তে তাদের মাত্র ১৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন বিনন্দপুর মদিনাতুল উলুম মাদরাসা ও এতিমখানা, সাতবাড়িয়া মাদরাসা ও এতিমখানা এবং সুজাতপুর দরবেশ বাড়ি মাদরাসা ও এতিমখানার কর্তৃপক্ষ। তাদের ভাষ্য, চালের পরিবর্তে ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে জিন নুরাইন ইসলামিয়া মাদরাসা, পশ্চিম ইসলামাবাদ মাদরাসা, ষাটনল আরাবিয়াতুল উম্মাহ মহিলা মাদরাসা, ষাটনল হাফেজ আব্দুল লতিফ দাখিল মাদরাসা, দারুল উলুম কাসেমিয়া হাফিজিয়া মাদরাসা, দশানী আল-আমিন আকরামিয়া মাদরাসা, সাড়ে পাঁচানী হোসাইনীয়া মাদরাসা, মোহনপুর আল হেরা মহিলা মাদরাসা, মুদাফর রহমানিয়া ইসলামিয়া মাদরাসা, মাথাভাঙ্গা মিলারচর মাদরাসা ও পাঁচআনী আমিয়া আরাবিয়া কাসেমুল উলুম মাদরাসাসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ, তারা এক টনের পরিবর্তে মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি চাল পেয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, উপজেলার কয়েকটি এলাকায় শুধু সাইনবোর্ড থাকলেও সেখানে এতিমখানা পরিচালনার বাস্তব কোনো কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানও সরকারি এক টন চালের বরাদ্দপ্রাপ্ত তালিকায় রয়েছে। এতে উপকারভোগী নির্বাচন ও বরাদ্দ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন। তাদের ধারণা, প্রভাবশালী কোনো মহলের মাধ্যমে এই অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে।

সাড়ে পাঁচানী হোসাইনীয়া মাদরাসা ও এতিমখানার সভাপতি এবং উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি নুরুল আমিন মাস্টার বলেন, "সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী এক টন চাল পাওয়ার কথা থাকলেও আমরা মাত্র ৬০০ কেজি চাল পেয়েছি। এতিমদের প্রাপ্য চাল আত্মসাতের অভিযোগ অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। বিভিন্ন জায়গায় জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি।"

8a9d207d-992f-4dea-969e-ffeba8b8f45e

উপজেলা বিএনপির সভাপতি বশির আহমেদ খান বলেন, এতিমদের জন্য বরাদ্দ চাল নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা ওসমান গনি বলেন, খাদ্য গুদাম থেকে কখনো তিনি নিজে, আবার কখনো অফিসের কর্মীদের মাধ্যমে এতিমখানার প্রতিনিধিদের কাছে চাল বিতরণ করা হয়েছে। তবে চাল কম পাওয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এমদাদুল হক বলেন, তালিকাভুক্ত প্রতিটি এতিমখানার নামে এক টন করে চালের ডিও ইস্যু করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত সব কাগজপত্র তাদের কাছে রয়েছে। বরাদ্দের পর বাইরে কোথাও অনিয়ম হয়ে থাকলে সে বিষয়ে তাদের জানা নেই।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, "এতিমখানাগুলোকে চাল দেওয়ার কথা, নগদ টাকা দেওয়ার কোনো বিধান নেই। চাল কম দেওয়ারও সুযোগ নেই। অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

স্থানীয়দের দাবি, এতিমদের খাদ্য সহায়তার মতো মানবিক কর্মসূচিতে অনিয়মের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত এতিমখানাগুলো যেন তাদের প্রাপ্য সরকারি সহায়তা পুরোপুরি পায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর