মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

প্রথম বিসিএসেই পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম নেত্রকোনার তানভীর

জেলা প্রতিনিধি, নেত্রকোনা
প্রকাশিত: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৬:১২ পিএম

শেয়ার করুন:

প্রথম বিসিএসেই পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম নেত্রকোনার তানভীর

একসময় সন্ধ্যা নামলেই বইয়ের পাশে জ্বলে উঠত হারিকেন। বিদ্যালয়ে যেতে প্রতিদিন হাঁটতে হতো প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। ছোট্ট একটি টিনশেড ঘরে অভাব-অনটনের মধ্যেই কেটেছে শৈশব। সেই সংগ্রামের পথ পেরিয়ে জীবনের প্রথম বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়েই পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হয়েছেন নেত্রকোনার তানভীর রহমান।

গত রোববার (২৮ জুন) প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএসের ফলাফলে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম স্থানে নাম আসে তার। ফল প্রকাশের পর থেকেই নেত্রকোনা সদর উপজেলার রায়দুম বাগড়া গ্রামে আনন্দের আবহ। পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসীর কাছে তানভীর এখন গর্বের নাম।

তানভীর রহমান নেত্রকোনা সদর উপজেলার রায়দুম বাগড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. আব্দুর রহমান ও রিনা পারভীনের ছেলে। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। তার বাবা নেত্রকোনার শামছুদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।

netrokona-2তানভীরের শৈশব কেটেছে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে। তখন গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। সন্ধ্যার পর হারিকেন কিংবা মোমবাতির আলোয় চলত পড়াশোনা। বিদ্যালয়ে যেতে প্রতিদিন পাড়ি দিতে হতো প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ। তবে প্রতিকূলতা কখনোই তার স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

ছেলের সাফল্যে আবেগাপ্লুত বাবা মো. আব্দুর রহমান বলেন, ‘ফলাফলের খবর শোনার পর আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেছি। আমার আর চাওয়ার কিছু নেই। যা চেয়েছি, তার চেয়েও বেশি পেয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই তানভীর খুব মনোযোগী ছিল। শুধু পড়াশোনা নয়, খেলাধুলাতেও আগ্রহ ছিল। প্রতিদিন হেঁটে স্কুলে যেত। বিদ্যুৎ না থাকায় হারিকেনের আলোয় রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও কখনো স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেনি।’

netrokona-3তানভীরের মা রিনা পারভীন বলেন, ‘আমাদের ছিল একটি ছোট টিনশেড ঘর। সেই ঘরেই সবাই মিলে থাকতাম, খেতাম। অনেক কষ্টের জীবন ছিল। কিন্তু আমার ছেলে কখনো হাল ছাড়েনি। ছোটবেলা থেকেই সময়ের মূল্য বুঝত। আড্ডা বা অকারণে সময় নষ্ট করত না। তার নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা ও কঠোর পরিশ্রমই আজকের এই সাফল্য এনে দিয়েছে।’

তানভীরের ছোট বোন সাদিয়া বলেন, ‘ভাই ছোটবেলা থেকেই নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন করতেন। নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে সব সময় সচেতন ছিলেন। তাই তার এই সাফল্যে আমরা বিস্মিত নই, বরং গর্বিত।’

শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপেই মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন তানভীর। ২০১৯ সালে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন। ২০২৫ সালে স্নাতক সম্পন্ন করে বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।

netrokona-4বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিয়মিত বিসিএসের প্রস্তুতি নিয়েছেন। প্রথমবার পরীক্ষায় অংশ নিয়েই পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হওয়ার এই অর্জন অনেকের কাছে বিস্ময়কর হলেও পরিবারের মতে, এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত প্রস্তুতি, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নিরলস পরিশ্রমের স্বাভাবিক ফল।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, একজন শিক্ষক পরিবারের সন্তান হিসেবে দেশের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এমন সাফল্য প্রমাণ করেছে—স্বপ্ন পূরণে অর্থই শেষ কথা নয়; প্রয়োজন দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রম।

তাদের প্রত্যাশা, দেশের পররাষ্ট্র সেবায় দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তানভীর রহমান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করবেন। একই সঙ্গে তার এই সাফল্য নেত্রকোনাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসংখ্য শিক্ষার্থীকে বড় স্বপ্ন দেখতে সাহস জোগাবে।

প্রতিনিধি/এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর