আর্থিক সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকার ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড নামের দুটি পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। হঠাৎ কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অন্তত ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। দীর্ঘদিনের কর্মস্থল হারিয়ে তারা চরম উদ্বেগ, হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
কারখানা সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ জুন থেকে প্রতিষ্ঠান দুটির উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। সম্প্রতি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে স্থায়ী বন্ধের ঘোষণা দিলে শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল-২-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খলিলুর রহমান বলেন, আর্থিক সংকটসহ নানা জটিলতার কারণে মালিকপক্ষ প্রতিষ্ঠান দুটি স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এদিকে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, সার্ভিস বেনিফিট ও অন্যান্য আইনানুগ পাওনা পরিশোধের বিষয়ে গত রোববার সকালে গাজীপুর শিল্প পুলিশ-২ এর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে একটি ত্রিপক্ষীয় আপস-মীমাংসা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন শিল্প পুলিশ-২ এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন।
বৈঠকে শিল্প পুলিশ, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতর (ডাইফ), শ্রম অধিদফতরের কর্মকর্তা, মালিকপক্ষের প্রতিনিধি, বিভিন্ন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা এবং শ্রমিক প্রতিনিধিরা অংশ নেন। মালিকপক্ষের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদ আহমেদ।
বৈঠক শেষে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের বিষয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শ্রমিকদের এপ্রিল মাসের বাকি ১৫ দিনের বেতন এবং মে মাসের ১৮ দিনের বকেয়া বেতন পরিশোধ করা হবে। একই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব বকেয়া বেতনও পরিশোধ করা হবে।
এ ছাড়া চাকরি অবসানের কারণে শ্রমিকদের ৩০ দিনের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ নোটিশ পে হিসেবে দেওয়া হবে। চাকরির প্রতি বছরের জন্য ২০ দিনের মূল বেতন হারে সার্ভিস বেনিফিট প্রদান করা হবে। প্রমাণ সাপেক্ষে মাতৃত্বকালীন সুবিধা, অর্জিত ছুটির অর্থ, পদত্যাগকারী শ্রমিকদের রিজাইন বেনিফিট এবং বিভিন্ন তহবিলে জমাকৃত অর্থও পরিশোধ করা হবে। ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ২৭ জুলাই শ্রমিকদের সব পাওনা একযোগে পরিশোধ করার কথা রয়েছে।
তবে এ চুক্তিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন শ্রমিক নেতারা। জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আশরাফুজ্জামান বলেন, ঈদের আগে বেতন-ভাতা ও বোনাস নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তা ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হয়। কিন্তু এরপরও মালিকপক্ষ কারখানা চালু না করে স্থায়ীভাবে বন্ধের পথ বেছে নিয়েছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত শত শত শ্রমিক একসঙ্গে বেকার হয়ে পড়েছেন এবং তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, ২১ জুনের চুক্তিটি পুরোপুরি শ্রমিকবান্ধব নয়। শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের প্রাপ্য সব সুবিধা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে অনেক শ্রমিক তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন।
স্থানীয় শ্রমিক নেতাদের মতে, গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে একের পর এক কারখানা বন্ধের ঘটনা শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে হাজারো শ্রমিক পরিবারের জীবিকা, সন্তানের শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এদিকে শ্রমিকরা দ্রুত তাদের পাওনা পরিশোধ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
প্রতিনিধি/এসএস




