নওগাঁয় সরকারি বনভূমি থেকে দিনে-রাতে গাছ কেটে উজাড় করছে কয়েকটি চক্র। এখানেই শেষ নয়, বনভূমি দখল করে গড়ে তোলা হচ্ছে বাড়ি আর প্রতিষ্ঠান। এইভাবে দখল হয়েছে কয়েকশ একর জায়গা। এসব জমিতে কেউ কেউ করছেন চাষাবাদও। তবে এসব অভিযোগের সঠিক জবাব নেই বন বিভাগের কাছে। লোকবল স্বল্পতার কথা বলেই দায় সারছেন তারা। এদিকে জায়গা দখল ও সামাজিক বনায়নের গাছ কেটে ফেলায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবেশকর্মীরা।
জানা যায়, নওগাঁর পত্নীতলা, ধামইরহাট ও সাপাহার উপজেলায় সবচেয়ে বেশি বনাঞ্চল রয়েছে। এ তিনটি বিটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হয় পত্নীতলা উপজেলার পাইকবান্দা বনবিট অঞ্চলে। সরেজমিনে দেখা যায়, পাইকবান্দা বনভূমির আওতায় কৃষ্ণপুর-আলপাকা সড়কের দু’পাশের বেশ কিছু বড়-ছোট বাড়ি গড়ে উঠেছে। যেগুলোর দু’একটি ইট কংক্রিটের তৈরি।
বিজ্ঞাপন
এমনই এক বাড়ির মালিকের নাম সহিমুদ্দিন। কিছুদিন আগে প্রায় ৩ শতক জায়গা গড়ে তুলেছেন একাধিক কক্ষ বিশিষ্ট বাড়ি। নিয়েছেন বৈদ্যুতিক লাইনও। তিনি বাহিরে থাকায় কথা হয় তার স্ত্রীর সাথে। নাম প্রকাশ না করা শর্তে তিনি জানান, তারা গরীব মানুষ। জায়গাজমি নেই। তাই বনের জায়গাতেই বাড়িটি নির্মাণ করে বসবাস করছেন তারা। দাবি করেন, বাড়ি নির্মাণ করতে গিয়ে স্থানীয় কিছু নেতাকর্মীকে টাকা দিতে হয়েছে।

সহিমুদ্দিনের বাড়ির পাশেই আরেকটি মাটির বাড়ি নির্মাণ করেছেন রিজিয়া নামের ২৮ বছর বয়সী এক নারী। টিনের চালায় দুটি ঘর ও একটি রান্না ঘর নির্মাণ করেছেন তিনি। সরকারি জায়গায় বাড়ি নির্মাণের কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, কোথাও মাথাগোঁজার জায়গা না পেয়ে প্রায় দেড় বছর আগে এই বাড়ি নির্মাণ করেছেন। শুরুতেই বন বিভাগের লোকজন তাকে বাধাও দেয়। কিন্তু তা উপেক্ষা করেই বাড়িটি সম্পন্ন করে বসবাস শুরু করেন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, দখলকারীদের অনেকেই জায়াগুলো নিজেদের দাবি করে বন বিভাগের বিরুদ্ধেই মামলা করেছেন। তেমনই একজন ধামইরহাট বনবিটের আওতায় জয়জয়পুর গ্রামের এটিএম বদিউজ্জমান। তিনি বলেন, আরএস রেকর্ড অনুযায়ী জায়গাটি তাদের পৈতৃক সম্পত্তি। সেখানে একটি পুরাতন বাড়িও ছিল। তবে এরই মধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে বন বিভাগ। জায়গাটি সরকারি বনভূমির অংশ দাবি করে রেকর্ড সংশোধনী মামলা করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। যার বাদী হয়েছেন স্থানীয় বনবিট কর্মকর্তা আনিসুর রহমান।
বিজ্ঞাপন

শুধু তাই নয়, দিনে রাতে বনের গাছ কাটছে কয়েকটি চক্র। এমনই একজন আলপাকা গ্রামের হাবিবুর হরমান। তার বাড়িতে গিয়ে দেখা মেলে বনের গাছের স্তূপ। যার মধ্যে বড় ছোট সবরকম গাছই আছে। তবে হাবিবুর রহমান বাড়িতে না থাকায় কথা হয় তার ছেলের বৌ মেরিজা খাতুনের সাথে। ভুল স্বীকার করে তিনি দাবি করেন, আশপাশের সবাই গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছিল বলে তারও কেটেছেন। তবে কাজটা ঠিক হয়নি বলেও জানান তিনি।
পত্নীতলা পাইকবান্দা বনবিট কর্মকর্তা জিল্লুর রহমানের সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছাড়া কথা বলা নিষেধ আছে। তবে জমি উদ্ধারে মামলা ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে প্রতিনিয়তই রিপোর্ট পাঠাচ্ছেন।
বন বিভাগের তিনটি বিটের দায়িত্বে থাকা রেঞ্জ কর্মকর্তা একেএম ফরহাদ জাহান বলেন, ‘লোকবল সংকটের কারণে দায়িত্ব পালন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে কেউ জায়গা দখলের চেষ্টা করলে প্রথমেই বাধা দেন। এরপর না শুনলে মামলা দায়ের করেন। এখন পর্যন্ত ৮শ ৯ একর জায়গা দখল রয়েছে নওগাঁ অঞ্চলে। যার বিপরীতে মামলা হয়েছে ৩ শতাধিক। তিনি বলেন, মামলার দীর্ঘ হওয়ায় জমি উদ্ধারে অনেক দেরি হয়। আর এই সুযোগকেই কাজে লাগায় ভূমি দখলকারী একটি চক্র।’
পরিবেশকর্মী নাইস পারভীন বলেন, এভাবে বনজ গাছ নিধন ও বনভূমি দখল করে বাড়ি, প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হয় এটা শঙ্কার বিষয়। তিনি বলেন, বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের গাফিলতিও এর জন্য দায়ী। কখনও কখনও তারা নিজেরাও এসবের পেছনে দায়ী। চক্রগুলোর সাথে তাদের সখ্যতা কিংবা স্বজন প্রীতির কারণেও এমনটা হয়ে থাকে। তবে এখনই যদি দখল আর গাছ কাটা চক্রগুলোকে না থামানো যায় তাহলে ভবিষ্যতে আরও খারাপ সময় দেখতে হবে।
প্রতিনিধি/এসএস




