রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষির দিকে ঝুঁকছেন পঞ্চগড়ের কৃষকরা। জৈব সার হিসেবে ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি ফলন ও লাভ বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। অধিক লাভে এলাকার কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে। এ ক্ষেত্রে সফলতার উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠেছেন পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার ধনমন্ডল এলাকার কৃষক সমিজ উদ্দিন।
এক সময় জমিতে প্রচলিত রাসায়নিক সার ব্যবহার করেও প্রত্যাশিত ফলন পাচ্ছিলেন না সমিজ উদ্দিন। উৎপাদন খরচ বাড়লেও লাভের পরিমাণ ছিল সীমিত। এমন পরিস্থিতিতে দেবীগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসের সহযোগিতায় দিনাজপুর অঞ্চল টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় একটি ভার্মি কম্পোস্ট প্রদর্শনী পান তিনি। এরপর থেকেই বদলে যেতে শুরু করে তার কৃষিকাজের চিত্র।
বিজ্ঞাপন

বর্তমানে সমিজ উদ্দিন নিজ উদ্যোগে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনকে সম্প্রসারণ করেছেন। শুরুতে মাত্র চারটি রিং দিয়ে উৎপাদন শুরু করলেও এখন তার রয়েছে ১২টি রিং এবং একটি হাউজ। এসবের মাধ্যমে তিনি প্রতি মাসে প্রায় ৮০০ কেজি ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করছেন। নিজের জমিতে ব্যবহারের পর অতিরিক্ত সার স্থানীয় কৃষকদের কাছে প্রতি কেজি ১২ থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি করছেন।
সমিজ উদ্দিন জানান, চলতি মৌসুমে তিনি এক বিঘা জমিতে চিচিঙ্গা এবং এক বিঘা জমিতে ঢেঁড়শ চাষ করেছেন। রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে ভার্মি কম্পোস্ট প্রয়োগের ফলে তার উৎপাদন খরচ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে গাছের স্বাস্থ্য, স্থায়িত্ব এবং ফলনও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
তিনি বলেন, আগে রাসায়নিক সারে খরচ বেশি হতো, কিন্তু ফলন অনুযায়ী লাভ পেতাম না। এখন ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহারে খরচ অনেক কমেছে। দুই বিঘা জমি থেকে ইতোমধ্যে প্রায় এক লাখ টাকা লাভ করেছি। আরও অন্তত এক মাস চিচিঙ্গা ও ঢেঁড়শ বিক্রি করতে পারবো। আমার উৎপাদিত সার আশপাশের কৃষকরা কিনে নিচ্ছেন। অনেকে আবার নিজেরাও ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনে আগ্রহী হচ্ছেন।
বিজ্ঞাপন

স্থানীয় কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারাও সমিজ উদ্দিনের সাফল্যকে ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা হুমায়ুন কাদের সরকার জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাকে একটি ভার্মি কম্পোস্ট প্রদর্শনী দেওয়া হয়েছিল। তবে নিজের পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও কর্মদক্ষতার মাধ্যমে তিনি সেটিকে সফল উদ্যোগে পরিণত করেছেন।
তিনি বলেন, সমিজ উদ্দিন শুধু নিজেই লাভবান হননি বরং এলাকার অন্যান্য কৃষকদেরও উদ্বুদ্ধ করছেন। তার এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে যে, আধুনিক ও টেকসই কৃষি প্রযুক্তি সঠিকভাবে প্রয়োগ করলে কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারেন।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ভার্মি কম্পোস্ট কেঁচোর মাধ্যমে উৎপাদিত একটি উচ্চমানের জৈব সার, যা মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি, মাটির গঠন উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদে জমির উৎপাদন ক্ষমতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়।
দেবীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাঈম মোর্শেদ বলেন, আমরা টেকসই কৃষি ব্যবস্থা সম্প্রসারণে কাজ করছি। কৃষকদের ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এই সার ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমবে, মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকবে এবং দীর্ঘমেয়াদে কৃষিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
প্রতিনিধি/টিবি




