শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ঢাকা

মুন্সিগঞ্জে ঝুঁকিপূর্ণ বেইলি ব্রিজে বাড়ছে জনদুর্ভোগ

জেলা প্রতিনিধি, মুন্সিগঞ্জ
প্রকাশিত: ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:৩২ এএম

শেয়ার করুন:

মুন্সিগঞ্জে ঝুঁকিপূর্ণ বেইলি ব্রিজে বাড়ছে জনদুর্ভোগ
তালতলা -গৌড়গঞ্জ খালের ওপরে, মাত্র দুটি পিলারের উপর নির্মিত- ৯৮ মিটারের কুন্ডার বাজার বেইলী ব্রিজ বন্ধ অবস্থার ছবিটি শুক্রবার দুপুরে তোলা / ঢাকা মেইল

১৯৯৮ সালে একটি বেইলি সেতু নির্মাণের পর, কেটে গেছে প্রায় ২৯ বছর। দীর্ঘ এই সময়ে জোড়াতালি দিয়ে সেতুটি অন্তত ৪১ বার মেরামত করেছে কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পে বরাদ্দ হলেও অদৃশ্য কারণে তিন বছরেও শুরু হয়নি নতুন প্রশস্ত পাকা সেতুর নির্মাণ কাজ। এমন পরিস্থিতিতে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে মুন্সিগঞ্জ জেলায় যাতায়াতের অন্যতম প্রধান সড়ক কুন্ডের বাজার বেইলি ব্রিজ পার হতে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ সেতুটি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার যানবাহন চলাচল করলেও, প্রশস্ত পাকা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়ন না হওয়ায়, যানবাহন চলাচলে বেড়েছে দুর্ভোগ।


বিজ্ঞাপন


অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতায়, দুই লেনের পাকা সেতু নির্মাণের জন্য উদ্বেগ নেওয়া হলেও তিন বছরেও তা আলোর মুখ দেখেনি। ফলে বৃদ্ধি পাচ্ছে দুর্ঘটনার শঙ্কা ও জনদুর্ভোগ।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, জরাজীর্ণ বেইলি সেতুতে উঠতে গিয়ে অচল হয়ে পড়ে আছে পণ্য বোঝাই ট্রাক। পাশেই পারাপার হতে গিয়ে আটকা পড়েছে মোটরসাইকেলসহ কয়েকজন যাত্রী।

এই পথে নিয়মিত যাতায়াতকারী যানবাহন চালক ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, প্রায়ই এমন অচল অবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে, মুন্সিগঞ্জের কুন্ডের বাজার সেতুর ওপরে। এতে উভয় প্রান্তে দেখা দেয় দীর্ঘ যানজট। ফলে বাধ্য হয়ে পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যেতে হয় অনেকের।

সদর উপজেলার সিপাহীপাড়া এলাকা থেকে গর্ভবতী অসুস্থ এক নারীকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে রাজধানী ঢাকা মেডিকেলের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া ভুক্তভোগী এক যাত্রী মামুনুর রশিদ বলেন, আমার স্ত্রীর প্রসব ব্যথা উঠেছে বাচ্চা হবে, স্থানীয় চিকিৎসক বলেছেন দ্রুত ঢাকায় নিয়ে যেতে। আমরা সিপাহীপাড়া থেকে কুন্ডের বাজার এসে এখানে আটকে ছিলাম প্রায় আধাঘণ্টা, পুলিশ বলছে সেতু বন্ধ যাওয়া যাবে না, তাই এখন অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আবার ঘুরে নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকার দিকে যাচ্ছি। এমন পরিস্থিতির শিকার হয়ে কি বলব ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।


বিজ্ঞাপন


সাপ্তাহিক ছুটির দিনে, মুন্সিগঞ্জ শহর থেকে ঢাকার মতিঝিলে একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাওয়ার পথে কুন্ডের বাজারে এসে যানজটে আটকে পড়া তরুণ শিক্ষার্থী রাজু মন্ডল বলেন, সকালে ৭টার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে রওনা দিয়েছি প্রায় তিন ঘণ্টার বেশি এখানে আটকে থেকে সাড়ে ১০টার দিকে বিকল্প পথে যাওয়ার চেষ্টা করছি। আমার দুপুরের মধ্যে ঢাকায় থাকতেই হবে ইন্টারভিউ বোর্ডে কথা বলার জন্য, একটা দুর্বিষহ ভোগান্তির অভিজ্ঞতা নিয়ে যাচ্ছি।

প্রতিনিয়তই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে এখানে, তবুও বিষয়টি নিয়ে কেউ সেভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে না।

অন্যদিকে, রাজধানীর বনানী থেকে মুন্সিগঞ্জ সদরের উদ্দেশে আসা ভুক্তভোগী নারী যাত্রী সালমা বেগম বলেন, প্রাইভেট কারে করে বাড়িতে যাচ্ছি প্রায় ২ ঘণ্টা হলো কুন্ডের বাজার ব্রিজের ঢালে এসে বসে ছিলাম পরে, ব্রিজ বন্ধ থাকায় এখন বিকল্প পথে মাওয়া দিয়ে ঘুরে যেতে হচ্ছে আমাদের এতে অতিরিক্ত সময় অপচয় হওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ভাড়া লাগছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক, এত জনগুরুত্বপূর্ণ একটি ব্রিজ কেন বড় প্রশস্ত পাকা করে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না সেটি কোনভাবেই বোধগম্য হচ্ছে না, সরকারের দ্রুত এই ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মার শাখায়, তালতলা-গৌড়গঞ্জ খালের ওপরে, মাত্র দুটি পিলার দিয়ে নির্মাণ করা হয় ৯৮ মিটারের বেইলি ব্রিজটি। এরপর, বিগত ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে, প্রায় ৮৪ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয় দুই লেনের ১৫২ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি পাকা সেতু নির্মাণের জন্য। অর্থ বরাদ্দ পেলে নতুন সেতু নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ওই বছরের নভেম্বরের ৭ তারিখে। এরপর কেটে গেছে প্রায় তিন বছর।

অভিযোগ উঠেছে, মুন্সিগঞ্জ সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের উদাসীনতায় অদৃশ্য কারণে বাস্তবায়ন হচ্ছে না নতুন পাকা সড়ক ও সেতু নির্মাণের উদ্যোগ। তবে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রাজি হয়নি সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে নিয়মিত সেতুর ওপরে ও দুই প্রান্তে প্রায়ই সৃষ্টি হওয়া যানজট সামাল দিতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। মুন্সিগঞ্জ ট্রাফিক পুলিশের টি-আই (প্রশাসন) মো. সাখোয়াত হোসেন বলেন, সকালে ও রাতে দুই বেলায় অন্তত ১০ জন পুলিশ সদস্য প্রতিদিন যানজট নিরসনে দায়িত্ব পালন করেন কুন্ডের বাজার সেতুর দুই প্রান্তে তবুও পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্টদের উচিত মানুষের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে দ্রুত প্রশস্ত পাকা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা।

এমন পরিস্থিতিতে কেন সেতুটির নির্মাণ কাজ স্থবির হয়ে আছে, সেটি নিয়ে সংসদ অধিবেশনেও প্রশ্ন তুলেছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ। তিনি বলেন, দ্রুত সমস্যা সমাধানে বারবার সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর দ্বারস্থ হলেও মিলছে না কোনো আশানুরূপ সাড়া। তবুও দ্রুত কুন্ডের বাজার এলাকায় প্রশস্ত পাকা সেতু নির্মাণের জন্য বর্তমান সরকারের সহযোগিতা কামনা করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, কুন্ডেরবাজার ব্রিজটি হয়ে গেলে টঙ্গীবাড়িসহ অন্যান্য উপজেলার মানুষের জীবনযাত্রা উন্নয়ন হবে। যাতায়াতের সুবিধা হবে এবং মালামাল পরিবহন সহজ হবে। টঙ্গীবাড়ি উপজেলার চেহারা বদলে যাবে। শুধু টঙ্গীবাড়িই না লৌহজং, শ্রীনগর, সিরাজদিখান উপজেলার মানুষ জেলা সদরে আসতে এই ব্রিজটি ব্যবহার করে। সেতুটি হয়ে গেলে জেলার চারটি উপজেলার মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন।

এ ছাড়া পদ্মার শাখা নদী তালতলা-গৌরগঞ্জ খাল জেলা সদরের সঙ্গে তিনটি উপজেলাকে বিভক্ত করেছে। শ্রীনগর-মুক্তারপুর-পঞ্চবটি আঞ্চলিক মহাসড়কের মতো টঙ্গীবাড়ি উপজেলার কুন্ডেরবাজারে পাকা সেতু নির্মাণ করা হলে এতে এলাকার উৎপাদিত কৃষিজাত পণ্য বাজারজাতসহ স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি পাকা ও প্রশস্ত সেতুটি নির্মাণ করা হলে উপকৃত হবে মুন্সিগঞ্জের পাঁচটি উপজেলার লাখো মানুষ।

প্রতিনিধি/এফএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর