জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার তুলশীগঙ্গা নদীর তীরের সন্যাসতলা মন্দিরের পাশে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী ঘুড়ির মেলা। গ্রামীণ এ মেলাটি সন্যাসতলীর ঘুড়ির মেলা হিসেবে পরিচিত।
মেলার সঠিক ইতিহাস কেউ বলতে না পারলেও জনশ্রুতি রয়েছে, সন্ন্যাসী পূজাকে ঘিরে ২০০ বছরের বেশি সময় আগে মেলাটির শুরু। সেই থেকে চলছে। এ বছরও মধু মাস জ্যৈষ্ঠের শেষে শুক্রবার (১২ জুন) মেলাটি শুরু হয়েছে। চলবে শনিবার পর্যন্ত।
বিজ্ঞাপন

ঐতিহ্যবাহী এ মেলাকে কেন্দ্র করে পুরো মেলাস্থল সব ধর্মের মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে। যতই মেলার সময় এগিয়ে আসে ততই যেন উৎসবমুখর হয়ে ওঠে এ উপজেলা। হাজারো মানুষের সমাগমে আনন্দের ফোয়ারা বয়ে যায় মেলাপ্রাঙ্গণে।
মেলাকে ঘিরে প্রতি বছর এলাকার অর্ধশত গ্রামে বাড়ি বাড়ি জামাই-মেয়েসহ আত্মীয়-স্বজনদের আগমন ঘটে। একদিন আগে থেকেই বিশাল এ মেলাকে কেন্দ্র করে দোকানিরা সাজিয়ে বসে তাদের পসরা। এবারও ৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসেছিল হরেক রকম ঘুড়ি, বিভিন্ন মৌসুমি ফলমূল, মিষ্টির পসরা। আর প্রধান আকর্ষণ হিসেবে ছিল অল্প মূল্যের বাঁশের তৈরি রঙিন ডালাকুলা, চাঙ্গারি, হাতপাখা ও মাছ শিকারের খৈলশানিসহ দেশীয় বিভিন্ন যন্ত্র ছাড়াও সাংসারিক কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন তৈজসপত্র। নানা বয়সি, নানা ধর্মের, হাজারো নারী-পুরুষের আনন্দমুখর স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে পুরো মেলাপ্রাঙ্গণ পরিণত হয় এক আনন্দ মোহনায়।
ক্ষেতলাল উপজেলা সদর থেকে ৮ কিলোমিটার দক্ষিণে মামুদপুর ইউনিয়নের মহব্বতপুর-জিয়াপুর গ্রামের তুলসীগঙ্গা নদীর কোলঘেঁষে বসে এই সন্ন্যাসতলীর মেলা। মেলার দ্বিতীয় তথা শেষ দিন শনিবার মেয়েদের কেনাকাটার জন্য উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। শনিবার সকালে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মেয়েরা মেলায় এসে সন্ন্যাস-ঠাকুরের পূজা-অর্চনা করেন। আর আশপাশে সুবিশাল এলাকাজুড়ে শিশু-কিশোর ও বৃদ্ধদের চলে ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব।
বিজ্ঞাপন

কোনো পুরস্কারের আয়োজন না থাকলেও সবাই মনের আনন্দে অংশ নেয় ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসবে। কে কত উঁচুতে ঘুড়ি ওড়াতে পারে- সে প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে। এ মেলাকে কেন্দ্র করে নানা বয়সের মানুষ মেতে ওঠে হরেক রকম ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসবে। কার ঘুড়ি কত উঁচুতে ওড়ে আর কে কার ঘুড়ির সুতা কেটে দিতে পারে, দিনভর চলে সে প্রতিযোগিতা। জামাই-মেয়ের পাশাপাশি স্বজনদের আপ্যায়নের রীতি এলাকায় চলে আসছে এ মেলাকে ঘিরেই।
স্থানীয় জিয়াপুর গ্রামের মহসিন আলী ও আয়ালগাড়ী গ্রামের তোফাজ্জল হোসেন বলেন, আমাদের বাপ-দাদারা এই মেলা করতেন, আমরাও এই মেলায় কেনাকাটা করতে আসি। সন্ন্যাসীর মেলাকে ঘিরে আশপাশের জেলা থেকে অনেক মানুষের সমাগম ঘটে।
মেলায় আসা বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজলার নাসির হোসেন ও দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার আরমান হোসেন বলেন, প্রতিবছর এই সন্ন্যাসতলী মেলায় আমরা আসি শুধু ঘুড়ি কিনতে। তবে ঘুড়ি ছাড়াও এখানে সব ধরনের জিনিসপত্র পাওয়া যায়।

সন্ন্যাসতলী মেলা কমিটির সভাপতি মন্টু চন্দ্র বলেন, প্রতিবছরের মতো এবারও বসেছে সন্ন্যাসতলী মেলা। এই মেলার বয়স ২০০ বছর। এটি আমরা হিন্দু-মুসলিম সবাই মিলে পরিচালনা করে থাকি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা এই মেলায় আসেন।
সন্যাসতলী মেলা কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এই সন্ন্যাসতলী মেলার মূল আকর্ষণ ঘুড়ি। আশপাশের জেলা থেকে বিপুল পরিমাণ মানুষের সমাগম ঘটে এখানে। এটি আদতে হয়ে উঠেছে সব ধর্মের, সব জাতের মানুষের মিলনমেলা।
এএইচ




