দীর্ঘ ৫৮ দিনের অপেক্ষার অবসান ঘটছে আজ মধ্যরাতে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবারও বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার প্রস্তুতি নিয়েছেন পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার প্রায় অর্ধলক্ষ জেলে। তবে সাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও বিরূপ আবহাওয়ার আশঙ্কা তাদের সেই প্রত্যাশায় কিছুটা শঙ্কার ছায়া ফেলেছে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) মধ্যরাতে শেষ হচ্ছে দেশের সামুদ্রিক জলসীমায় মাছ আহরণের ওপর আরোপিত ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা।
বিজ্ঞাপন
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আগমুহূর্তে আলীপুর ও মহিপুর মৎস্যবন্দর জুড়ে দেখা গেছে উৎসবমুখর কর্মচাঞ্চল্য। জেলেরা ব্যস্ত সময় পার করছেন, জাল ও মাছ ধরার সরঞ্জাম প্রস্তুত করতে, মাঝিরা শেষ মুহূর্তের জন্য ট্রলার ও ইঞ্জিন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। অন্যদিকে মাছের আড়তগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে, বরফ কলগুলোতেও শুরু হয়েছে নতুন উদ্যমে উৎপাদনের প্রস্তুতি।
গত ১৪ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া নিষেধাজ্ঞার সময়ে সাগরে সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ ছিল। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার জেলে পরিবারকে চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাতে হয়েছে।
জেলে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সরকার যে চাল সহায়তা করে তা এক মাসের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। এরপর সংসার চালাতে অনেক ঋণ ও ধার-দেনা করতে হয়।
সমুদ্রগামী ‘মা-বাবার দোয়া’ ট্রলারের মাঝি ইব্রাহিম জানান, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বৃহস্পতিবার রাতেই গভীর সমুদ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন তারা। তবে আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে যাত্রা বিলম্বিত হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, প্রত্যাশিত মাছ না পেলে জেলেদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
বিজ্ঞাপন
জেলেদের দাবি, নিষেধাজ্ঞার সুফল ধরে রাখতে অবৈধ ট্রলিং ও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় মাছের প্রজনন ও সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
‘মায়ের দোয়া’ ট্রলারের মালিক মিজানুর রহমান বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময়ে ট্রলার মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে অনেক অর্থ ব্যয় হয়েছে। অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়েছেন। তাই নতুন মৌসুমে ভালো মাছের আশায় রয়েছি।
কলাপাড়া মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে আলীপুর ও মহিপুর মৎস্যবন্দরসহ উপজেলার বিভিন্ন আড়তে প্রায় ৩৩ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ ও অন্যান্য সামুদ্রিক মাছ আহরণ হয়েছিল। তবে চলতি অর্থবছরে সেই উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
মৎস্য গবেষক ও শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-এর সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে না। মাছের প্রজনন ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হলে নিষিদ্ধ জালের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ বন্ধের পাশাপাশি জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞার ফলে সামুদ্রিক মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে আমরা আশা করছি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে জেলেরা ভালো মাছ পাবেন এবং চলতি মৌসুমের উৎপাদন ঘাটতি অনেকটাই পূরণ হবে। এতে জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা আবারও লাভের মুখ দেখতে পারবেন।
উপকূলজুড়ে এখন একটাই প্রত্যাশা— আবহাওয়া স্বাভাবিক থাকুক, সাগর ভরে উঠুক মাছের প্রাচুর্যে, আর দীর্ঘদিনের সংকট কাটিয়ে নতুন আশার আলো দেখুক হাজারও জেলে পরিবার।
প্রতিনিধি/ এজে




