মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬, ঢাকা

বজ্রপাত ঠেকাতে ঠাকুরগাঁওয়ে অকার্যকর সরকারি উদ্যোগ

মো. জাহিদ হাসান মিলু, ঠাকুরগাঁও
প্রকাশিত: ০২ জুন ২০২৬, ০৬:০৪ পিএম

শেয়ার করুন:

বজ্রপাত ঠেকাতে ঠাকুরগাঁওয়ে অকার্যকর সরকারি উদ্যোগ
জেলা পরিষদের উদ্যোগে দুই উপজেলায় বজ্রপাত নিরোধক স্থাপন এবং ফসলি মাঠের আশপাশে খোলা জায়গায় আশ্রয়ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। ছবি: ঢাকা মেইল

দেশব্যাপী বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে একসময় তালগাছ রোপণসহ নানা উদ্যোগ ও প্রকল্প নেওয়া হলেও তার বাস্তব ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। কোথাও পরিচর্যার অভাবে, কোথাও গরু-ছাগলের আক্রমণে, আবার কোথাও তদারকির ঘাটতিতে হারিয়ে গেছে তালগাছ। এমন পরিস্থিতিতে বজ্রপাতে প্রাণহানি কমাতে ঠাকুরগাঁওয়ে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনও কার্যকর সরকারি সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁওয়ে অতীতে বজ্রপাত প্রতিরোধে তালগাছ রোপণ কিংবা বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড স্থাপনের কোনো বড় সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো জেলার হরিপুর ও বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় বজ্রপাত প্রতিরোধ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। এ দুই উপজেলার জন্য মোট আট লাখ ৪০ হাজার টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আফাজ উদ্দিন জানান, জেলা পরিষদের উদ্যোগে দুই উপজেলায় বজ্রপাত নিরোধক স্থাপন এবং ফসলি মাঠের আশপাশে খোলা জায়গায় আশ্রয়ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় মাঠে কর্মরত কৃষকরা যাতে নিরাপদ আশ্রয় নিতে পারেন, সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। 

Tal_Gach_ii
পাহাড়ভাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা খোরশেদ আলী ব্যক্তিগত উদ্যোগে ৫২ হাজারের বেশি তালবীজ ও চারা রোপণ করেছেন।  ছবি: ঢাকা মেইল

 

অন্যদিকে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, গত দুই বছরে বজ্রপাত নিরোধক কিংবা তালগাছ রোপণ সংক্রান্ত কোনো সরকারি প্রকল্প বা বরাদ্দ তাদের দফতরে আসেনি।
 
তবে কৃষি বিভাগের নিজ উদ্যোগে কিছু তালগাছ রোপণ করা হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. মাজেদুল ইসলাম জানান, কৃষি বিভাগের নিজস্ব উদ্যোগে গত বছর ৪৫০টি এবং প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় আরও পাঁচ হাজার তালগাছ জেলার বিভিন্ন এলাকায় রোপণ করা হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


এছাড়া ২০২৩ সালে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসির উদ্যোগে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সড়কের পাশে এক হাজার তালগাছ রোপণ করা হয়।

তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিচর্যা ও তদারকির অভাবে অধিকাংশ স্থানে রোপণ করা তালগাছের চারা এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। কোথাও গবাদিপশুর আক্রমণে, কোথাও অবহেলায় চারা নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে বজ্রপাত প্রতিরোধে এসব উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

এ অবস্থায় ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সদর উপজেলার পাহাড়ভাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা খোরশেদ আলী। ব্যক্তিগত উদ্যোগে তিনি ৫২ হাজারের বেশি তালবীজ ও চারা রোপণ করেছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে সেগুলোর পরিচর্যা করে আসছেন। 

Tal_Gach
নিজের লাগানো তালগাছের পরিচর্যাও করেন খোরশেদ আলী।  ছবি: ঢাকা মেইল

 

এলাকাবাসীর মতে, খোরশেদ আলীর লাগানো গাছগুলোই বর্তমানে সবচেয়ে দৃশ্যমান ও টিকে থাকা তালগাছের উদাহরণ। অন্যদিকে বিভিন্ন সময়ে সরকারি উদ্যোগে রোপণ করা অধিকাংশ গাছই এখন বিলুপ্তপ্রায়।

আবহাওয়াবিদদের মতে, তালগাছ সরাসরি বজ্রপাত প্রতিরোধ না করলেও উঁচু বৃক্ষ হিসেবে অনেক ক্ষেত্রে বজ্রপাতের আঘাত নিজের ওপর নিয়ে আশপাশের এলাকা ও মানুষের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড সঠিকভাবে স্থাপন ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে তা মানুষের জীবন রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ঠাকুরগাঁওয়ে বজ্রপাতে অন্তত দুজনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল আটজন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাতের ঝুঁকি বাড়লেও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু প্রকল্প গ্রহণ করলেই হবে না; তালগাছ রোপণের পর নিয়মিত পরিচর্যা, বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে টেকসই উদ্যোগ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে প্রতি বছর বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা কমানো কঠিন হয়ে পড়বে। ঠাকুরগাঁওয়ের বাস্তবতা সেই প্রয়োজনীয়তার কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে।

প্রতিনিধি/ক.ম/ 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর