মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬, ঢাকা

অন্তঃসত্ত্বা নারীর রহস্যজনক মৃত্যু: নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগ

জেলা প্রতিনিধি, ঠাকুরগাঁও
প্রকাশিত: ০১ জুন ২০২৬, ১০:৫৩ পিএম

শেয়ার করুন:

অন্তঃসত্ত্বা নারীর রহস্যজনক মৃত্যু: নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগ

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের বন্দরপাড়া গ্রামে আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ মিতু আক্তারের (২০) রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের পরিবারের দাবি, যৌতুকের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন মিতু। তবে এটি আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড— তা নিয়ে এলাকায় তীব্র আলোচনা ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ঘটনাটি ঘটে গত শনিবার (৩০ মে) বিকেলে। স্বামীর বাড়ি থেকে অচেতন অবস্থায় মিতুকে উদ্ধার করা হয়। পরে তার মৃত্যু হয়। তবে মৃত্যুর দুই দিন পর সোমবার (১ জুন) বিকেলে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বজনরা।


বিজ্ঞাপন


এ ঘটনায় নিহতের স্বামী শাহিনুর রহমান (চান্দু), শ্বশুর মো. মুসলিম উদ্দীন এবং শাশুড়ি মোছা. সাহেরা খাতুনের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনা ও সহায়তার অভিযোগে ঠাকুরগাঁও সদর থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। রোববার রাতে নিহতের বাবা দেবারু মোহাম্মদ বাদী হয়ে মামলাটি করেন।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, প্রায় দেড় বছর আগে সদর উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের আরাজি রামপুর গ্রামের বাসিন্দা দেবারু মোহাম্মদের মেয়ে মিতু আক্তারের সঙ্গে বন্দরপাড়া গ্রামের শাহিনুর রহমানের বিয়ে হয়।

পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে মিতুর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার দুই পরিবারের মধ্যে বৈঠক হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, শাহিনুর রহমান মাদক ও জুয়ায় আসক্ত ছিলেন এবং সংসারে প্রায়ই অশান্তি সৃষ্টি করতেন।

নিহতের পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন বাবার বাড়িতে যাওয়ার জন্য স্বামীর কাছে কিছু টাকা চান মিতু। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে শাহিনুর রহমান তাকে মারধর করেন। এ সময় শ্বশুর ও শাশুড়িও যৌতুকের বিষয় নিয়ে গালিগালাজ ও নির্যাতনে অংশ নেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিনের নির্যাতন ও সেদিনের ঘটনার কারণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন মিতু। একপর্যায়ে তিনি আত্মহত্যার কথা বললে স্বামী তাকে উসকানিমূলক কথা বলেন বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

পরে বিকেলে ঘরের মেঝেতে মিতুকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। স্বামীর পরিবারের দাবি, তাকে প্রথমে ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুরে নেওয়া হয়েছিল। তবে নিহতের পরিবার এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলছে, মিতুর মৃত্যু বাড়িতেই হয়েছে।

আত্মহত্যার দাবি মানতে নারাজ নিহতের পরিবার। তাদের অভিযোগ, আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা মিতুকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে।

নিহতের বাবা দেবারু মোহাম্মদ বলেন, আমার মেয়ে আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল। জুন মাসেই তার সন্তান জন্ম নেওয়ার কথা ছিল। শুধু আমার মেয়েই নয়, তার গর্ভের নিষ্পাপ সন্তানটিও পৃথিবীর আলো দেখার আগেই চলে গেল। যৌতুকের জন্য প্রায়ই তাকে মারধর করা হতো। মেয়ের সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য অনেক কিছু সহ্য করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচাতে পারলাম না।

তিনি আরও বলেন, মরদেহ বাড়িতে আনার পর গোসল করানোর সময় শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখতে পাই। তখন আমার বুক ফেটে কান্না এসেছে। যে মেয়েকে এত আদর-যত্ন করে বড় করেছি, তাকে এভাবে হারাতে হবে কখনো ভাবিনি। আমি চাই যারা আমার মেয়ের মৃত্যুর জন্য দায়ী, তাদের প্রত্যেকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

ঘটনার পর মরদেহ থানায় নেওয়া হলেও দ্রুত ময়নাতদন্ত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বজনরা। তাদের অভিযোগ, রোববার দিন এবং রাত পেরিয়ে গেলেও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়নি। পরে সোমবার (১ জুন ) বিকেল ৩টার দিকে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরিবারের দাবি, দ্রুত ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে সুবিধা হতো।

ঠাকুরগাঁও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনির হোসেন জানান, আইনগত প্রক্রিয়া শেষে সোমবার বিকেলে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলার আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

এদিকে ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. খোদাদাদ হোসেন বলেন, মরদেহটি গতকাল সকালেই থানায় আনা হয়েছিল। ময়নাতদন্তের জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব আইনগত ও প্রশাসনিক কার্যক্রম যথাসময়ে সম্পন্ন করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কিছু কারিগরি ও প্রক্রিয়াগত কারণে ময়নাতদন্তে বিলম্ব হয়েছে। সম্ভবত দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক বা ডোমের অনুপস্থিতির কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি আরও জানান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে দ্রুততম সময়ে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের মধ্যে ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে আত্মহত্যার অভিযোগ, অন্যদিকে নির্যাতন করে হত্যার দাবি— দুই পক্ষের বক্তব্যে সৃষ্টি হয়েছে ধোঁয়াশা। বর্তমানে পলাতক রয়েছেন নিহতের স্বামী শাহিনুর রহমান। পুলিশ বলছে, আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

এদিকে আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক নারীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই সঙ্গে মিতু ও তার অনাগত সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায় ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন তার স্বজন ও স্থানীয়রা।

প্রতিনিধি/এফএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর