ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বিরাসার এলাকার বাসিন্দা পারভীন আক্তার (৫৫)-এর পচাগলা মরদেহ স্বামী ও সন্তানসহ স্বজনরা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালে মানবিক উদ্যোগে দাফনের দায়িত্ব নেয় সামাজিক সংগঠন ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’।
শনিবার (৩০ মে) বিকেলে শহরের পূর্ব মেড্ডা তিতাস নদীসংলগ্ন বেওয়ারিশ লাশের কবরস্থানে মরদেহটি দাফন করা হয়। এ নিয়ে সংগঠনটির উদ্যোগে মোট ২৫৫টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন সম্পন্ন হলো।
বিজ্ঞাপন
সংগঠন সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (২৯ মে) পারভীন আক্তারের সাবেক স্বামী বাচ্চু মিয়া; দুজনের মধ্যে আগেই তালাক হয়েছিল- মরদেহ দাফনের জন্য বাতিঘরের কাছে আবেদন করেন। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মরদেহটি সংগঠনটির কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (২৮ মে) ঈদের দিন সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে সদর উপজেলার নাটাই উত্তর ইউনিয়নের বিরাসার গ্রামের পাল্লা পুকুরপাড় এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে পারভীন আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘ সময় ঘরের ভেতরে পড়ে থাকায় মরদেহটি পচে-গলে যায় এবং শরীরে পোকা ধরে। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে বাড়ির মালিক পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
আরও পড়ুন: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিচারকের ফ্ল্যাটের তালা ভেঙে দুর্ধর্ষ চুরি
ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হলেও অতিরিক্ত পচন, পোকা ও দুর্গন্ধের কারণে সাবেক স্বামী বাচ্চু মিয়া, দুই মেয়ে রত্না বেগম ও ফাতেমা, বড় মেয়ের স্বামী কবির মিয়াসহ পরিবারের সদস্যরা মরদেহ গ্রহণে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে বাচ্চু মিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের কাছে মরদেহটি দাফনের অনুরোধ জানান।
বিজ্ঞাপন

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, পারভীন আক্তার কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব উপজেলার মৃত রেজ্জাক মিয়ার মেয়ে। প্রায় ৩৫ বছর আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার ভলাকুট ইউনিয়নের বারুইচিড়া গ্রামের দুর্গাপুর এলাকার বাসিন্দা বাচ্চু মিয়ার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাদের সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ে জন্ম নেয়। পরে সড়ক দুর্ঘটনায় ছেলের মৃত্যু হয়। বড় মেয়ে রত্না বেগমের বিয়ে হয় সদর উপজেলার ঘাটুরা এলাকার কবির মিয়ার সঙ্গে।
পরবর্তীতে পারভীন আক্তার প্রথম স্বামীকে তালাক দিয়ে আশুগঞ্জ উপজেলার তালশহর এলাকার ইসহাক মৃধাকে বিয়ে করেন। দ্বিতীয় সংসারে তাদের কন্যাসন্তান ফাতেমার জন্ম হয়। কিছুদিন পর দ্বিতীয় স্বামী ইসহাক মৃধা স্ট্রোকে মারা যান। পরবর্তী সময়ে পারভীন আক্তারও একাধিকবার স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। ছোট মেয়ের বিয়ের পর তিনি দীর্ঘদিন বিরাসারের একটি ভাড়া বাসায় একাই বসবাস করছিলেন।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, পারভীন আক্তারের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছিল। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নানা কারণে উভয় পক্ষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। এছাড়া মরদেহটি দীর্ঘ সময় পড়ে থাকায় সম্পূর্ণ পচে গিয়েছিল এবং তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। এসব কারণের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অভিমানও মরদেহ গ্রহণে অনাগ্রহের কারণ বলে জানিয়েছেন তারা।

আরও পড়ুন: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাদক কেনাবেচা নিয়ে টর্চ লাইট জ্বালিয়ে সংঘর্ষ, নিহত ১
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) এম এম রকীব উর রাজা বলেন, ‘আমি নিজে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠাই। রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পরও পরিবারের পক্ষ থেকে মরদেহ গ্রহণে অনীহা ছিল। বিষয়টি জানার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরকে দাফনের ব্যবস্থা করতে বলা হয়। সংগঠনটি অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে দাফন সম্পন্ন করেছে।’
উল্লেখ্য, ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর গত পাঁচ বছর ধরে নিজস্ব অর্থায়নে বেওয়ারিশ লাশ দাফন এবং অসহায় ও অজ্ঞাত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে। এ পর্যন্ত সংগঠনটি ২৫৫টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেছে এবং দুই হাজারেরও বেশি রোগী চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন। পাশাপাশি রক্তদান, অক্সিজেন সেবা এবং অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো মানবিক কার্যক্রমও নিয়মিত পরিচালনা করছে সংগঠনটি।




