নদী, মেঠোপথ, পাশ ঘেঁষে চলে যাওয়া মহাসড়ক আর রেললাইনের চিরচেনা মিতালি। পরিমাপের ফিতায় মাপলে পুরো গ্রামের এক মাথা থেকে অন্য মাথার দূরত্ব আধা কিলোমিটারও হবে না। বলা হয়ে থাকে, এটি জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলার সবচেয়ে ছোট গ্রাম। নাম তার চেঁচিয়াবাধা। কিন্তু মানচিত্রে এই গ্রামটি যতটাই ক্ষুদ্র, এখানকার মানুষের হৃদয়ের পরিধি আর পারস্পরিক সৌহার্দ্য ঠিক ততটাই বিশাল।
ক্ষুদ্র এই গ্রামটিতেই প্রতি বছর পবিত্র ঈদুল আজহায় রচিত হয় এক অনন্য সম্প্রীতির মহাকাব্য। যেখানে ধনী-দরিদ্রের দেওয়াল ঘুচিয়ে, ১৭৫টি পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে এক মাঠে কোরবানি দেন। দীর্ঘ প্রায় ৩২ বছর ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য আজ কেবল জামালপুরেই নয়, গোটা দেশের বুকে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে।
বিজ্ঞাপন

যমুনার তীরে 'মিনা বাজার'
ঈদের নামাজ শেষ হলেই চেঁচিয়াবাধা গ্রামের রূপ বদলে যায়। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা প্রমত্তা যমুনা নদীর তীরে বসে এক উৎসবমুখর মেলা। কোরবানির মাঠকে সাধারণত 'মিনা বাজার' নামে ডাকেন। ইসলামের ঐতিহাসিক মিনা প্রান্তরের ত্যাগের মহিমাকে স্মরণ করেই এই নামকরণ।
গ্রামের ছোট-বড়, আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই এসে জড়ো হন এই মিনা বাজারে। সারি সারি গরু, ছাগল আর ভেড়া নিয়ে হাজির হন সামর্থ্যবানরা। তবে এখানে কেউ একা নন; সবার আনন্দ, সবার শ্রম যেন এক সুতোয় গাঁথা।
বিজ্ঞাপন

যেভাবে শুরু: ১৯৯৫ সালের দিকে গ্রামের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব মাওলানা নুরুল হক জামালীর হাত ধরে এই সাম্য ও সম্প্রীতির প্রথার সূচনা হয়। তিনি চেয়েছিলেন ইসলামের মূল শিক্ষা—অর্থাৎ ত্যাগের আনন্দ যেন সবার মাঝে সমভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তার সেই দূরদর্শী উদ্যোগ আজ তিন দশক পেরিয়ে ৩২ বছরে পদার্পণ করেছে, যা আজও একচুলও ম্লান হয়নি।
চেঁচিয়াবাধা গ্রামের এই কোরবানির সবচেয়ে সুন্দর দিকটি ফুটে ওঠে এর মাংস বণ্টন প্রক্রিয়ায়। কোরবানি শেষে সমস্ত মাংস এক জায়গায় একত্র করা হয়। এরপর সুনিপুণ ও সুশৃঙ্খলভাবে তা ভাগ করা হয় গ্রামের প্রতিটি পরিবারের জন্য। পরিবারটি কোরবানি দিতে পেরেছে কি পারেনি, সেটি এখানে বিবেচ্য নয়। সম বণ্টনের মাধ্যমে ১৭৫টি পরিবারের প্রতিটি ঘরে সমান ভাগে মাংস পৌঁছে দেওয়া হয়।

লোকচক্ষুর অন্তরালে যেন কোনো দুস্থ পরিবারকে হাত পাততে না হয়, তা নিশ্চিত করে এই পদ্ধতি। এর ফলে ঈদের দিন এই গ্রামের কোনো একটি উনুনও মাংস ছাড়া থাকে না। ধনীর আভিজাত্য আর গরিবের আক্ষেপ-দুইয়ে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় এক পরম তৃপ্তিতে।
যুগের পরিবর্তনে অনেক সমাজেই যখন ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা আর দূরত্বের দেয়াল বাড়ছে, তখন চেঁচিয়াবাধা গ্রামের তরুণ প্রজন্ম এই ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে পরম মমতায়।

স্থানীয় প্রবীণদের মতে, এই এক মাঠে কোরবানি দেওয়ার রেওয়াজ শুধু মাংসের ভাগাভাগি নয়; এটি গ্রামের মানুষের মধ্যকার ঝগড়া-বিবাদ ও অহংকার দূর করার এক মহৌষধ।
ছোট্ট ভৌগোলিক সীমানার চেঁচিয়াবাধা গ্রামটি আজ আমাদের শিখিয়ে দেয়, সম্প্রীতির সুবাস ছড়াতে বিশাল কোনো ভূখণ্ডের প্রয়োজন হয় না, এক চিলতে সুন্দর মন আর মাটির টানই যথেষ্ট।
প্রতিনিধি/এসএস




