পবিত্র ঈদুল আজহাকে ঘিরে যখন চারদিকে উৎসবের আমেজ, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগিতে ব্যস্ত মানুষ, তখনও নিরবচ্ছিন্নভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। ঈদের ছুটিতে রোগীর সংখ্যা কম থাকলেও থেমে নেই চিকিৎসাসেবা।
বুধবার (২৭ মে) দিবাগত রাত ১টার দিকে সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, অন্যান্য দিনের তুলনায় রোগীর উপস্থিতি অনেকটাই কম। হাসপাতালের অধিকাংশ ওয়ার্ডে ছিল স্বস্তির পরিবেশ।
বিজ্ঞাপন
তবে রোগী কমলেও দায়িত্বে কোনো শৈথিল্য নেই স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে। হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে ভর্তি রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কমে এসেছে। মেডিসিন বিভাগের ৪৬ বেডে ভর্তি রয়েছেন ১২ জন রোগী। অর্থোপেডিক্স বিভাগে ২০ বেডে ৮ জন, ডায়রিয়া বিভাগে ২০ বেডে ১০ জন, শিশু বিভাগে ২৫ বেডে ৮ জন শিশু এবং স্ক্যান সেন্টারে ৮ নবজাতক, হামের আইসোলেশন বিভাগে ৩১ বেডে ৩১ জন শিশু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এছাড়া সার্জারি বিভাগে ৪৬ বেডে ৫ জন, গাইনি বিভাগে ২৩ বেডে ৬ জন, কার্ডিওলজি বিভাগে ২৬ বেডে ৭ জন, পেইং বিভাগে ২৪ বেডে মাত্র একজন এবং কেবিনে ১৮ বেডে ১৩ জন রোগী ভর্তি আছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে বর্তমানে সব মিলিয়ে প্রায় ৭৮ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অথচ স্বাভাবিক সময়ে রোগীর চাপ থাকে কয়েকগুণ বেশি। ঈদকে সামনে রেখে তুলনামূলক সুস্থ অনেক রোগী আগেই ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি চলে গেছেন। কেউ কেউ আবার সকালে চিকিৎসা শেষে পরিবারের কাছে ফিরবেন বলে জানিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
তবে রোগী কমলেও হাসপাতালের জরুরি বিভাগসহ সব ধরনের চিকিৎসাসেবা চালু রয়েছে। রাত গভীর হলেও জরুরি বিভাগে দেখা যায় কর্মব্যস্ততা। কেউ রোগীকে ওষুধ দিচ্ছেন, কেউ চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্র প্রস্তুত করছেন, আবার কেউ রোগীদের খোঁজখবর নিচ্ছেন।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সিনিয়র স্টাফ নার্স অমিত পবিত্র গোমেজ বলেন, ‘ঈদ মানেই পরিবারের সঙ্গে আনন্দের সময়। কিন্তু হাসপাতালের রোগীদের তো আর উৎসব বলে থেমে থাকার সুযোগ নেই। তাই দায়িত্বের জায়গা থেকে আমরা সবসময় প্রস্তুত থাকি। রোগীরা যেন কোনো ধরনের সেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সেটাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’
হাসপাতালের চতুর্থ তলার মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র স্টাফ নার্স পূজা রায় বলেন, ‘অন্যান্য ওয়ার্ডের তুলনায় আমাদের ওয়ার্ডে রোগীর চাপ বেশি। এখানে বেশিরভাগ রোগীই বিষপানে আক্রান্ত। এছাড়া শ্বাসকষ্ট ও সাধারণ রোগেও অনেকে ভর্তি আছেন। ঈদের দিনেও ছুটি না পেলেও রোগীদের সেবা দিতে পারার মধ্যেই মানসিক শান্তি খুঁজে পাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি সনাতনী ধর্মাবলম্বী হওয়ায় মুসলিম সহকর্মীরা যেন পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারেন, সে জন্য দায়িত্ব পালন করি। এতে আমারও ভালো লাগে।’
এদিকে কার্ডিওলজি বিভাগের সিনিয়র স্টাফ নার্স পারভীন আক্তার বলেন, ‘ঈদের সময় সাধারণত হাসপাতালে রোগীর চাপ কিছুটা কমে যায়। যারা তুলনামূলক সুস্থ থাকেন, তারা পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে বাড়ি চলে যান। তারপরও হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের সেবায় আমরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করি। পরিবার থেকে দূরে থাকলেও রোগীদের সুস্থ হয়ে ওঠা দেখেই ভালো লাগে। আমি স্বেচ্ছায় ঈদের ডিউটির দায়িত্ব নিয়েছি।’

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার ঢালী বলেন, ‘ঈদ, পূজা বা যেকোনো উৎসবই হোক না কেন, চিকিৎসাসেবা কখনো বন্ধ থাকে না। সরকারি দায়িত্বের পাশাপাশি এটি মানবিক দায়িত্বও। তাই চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা ছুটি বা উৎসবের মধ্যেও রোগীদের সেবায় নিয়োজিত থাকেন। হাসপাতালের জরুরি বিভাগসহ সব ধরনের সেবা চালু রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঈদের সময় অনেক রোগী স্বাভাবিকভাবেই বাড়ি চলে যান। এতে হাসপাতালে চাপ কিছুটা কমে। তবে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রস্তুত রয়েছে।’
ঈদের আনন্দঘন মুহূর্তেও হাসপাতালের নীরব করিডোর আর দায়িত্বে থাকা স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যস্ততা যেন এক ভিন্ন বাস্তবতার গল্প বলে, যেখানে উৎসবের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে মানবসেবা, দায়িত্ববোধ আর পেশাগত অঙ্গীকার।
এএইচ




