বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬, ঢাকা

‘ঈদের দিনও ডিউটি আছেরে ভাই, আমাগের কোনো ছুটি নেই’

মো. হাবিবুর রহমান, নড়াইল
প্রকাশিত: ২৭ মে ২০২৬, ০৯:৪০ পিএম

শেয়ার করুন:

‘ঈদের দিনও ডিউটি আছেরে ভাই, আমাগের কোনো ছুটি নেই’
এটিএম বুথের সিকিউরিটি গার্ড মো. ইমদাদুল শেখ।

মো. ইমদাদুল শেখ, পেশায় এটিএম বুথের সিকিউরিটি গার্ড। বয়স ৫০ ছুঁই ছুঁই। শারীরিক জটিলতায় তেমন ভারি কাজ করতে পারেন না। বাধ্য হয়ে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করেন। আগেভাগে বলে রাখলেও ঈদের ছুটি মেলে না। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। ঈদে ছুটি নেই। ডিউটি আছে। টানা ১২ ঘণ্টা ডিউটি করতে হবে। তারপর মাস শেষে বেতন মাত্র ৯ হাজার টাকা। এটা হলো সিকিউরিটি গার্ড মো. ইমদাদুল শেখের গল্প। তার মতো এমন অনেক সিকিউরিটি গার্ড উপজেলার কয়েকটি বুথে ডিউটিতে থাকবেন চাকরির দায়ে এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে।

বুধবার (২৭ মে) সকালে সরেজমিনে ঢাকা মেইল প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় ইমদাদুল শেখসহ একই এলাকায় কর্মরত আরো কয়েকজন সিকিউরিটি গার্ডের সঙ্গে।


বিজ্ঞাপন


সিকিউরিটি গার্ড ইমদাদুল শেখ নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার লক্ষীপাশা এলাকায় একটি বেসরকারি ব্যাংকের এটিএম বুথে চাকরি করেন। তার বাড়ি একই এলাকার দিঘলিয়া ইউনিয়নের কোলা এলাকায়। প্রায় ১৫ বছর ধরে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করেন তিনি। তিন মেয়েসহ ৬ সদস্যদের পরিবার। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। এক ছেলে একটি দোকানে কর্মচারী হিসেবে কর্মরত। ছোট মেয়ে ক্লাস সিক্সে পড়ে। থাকেন কর্মরত এটিএম বুথ থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে নিজ বাড়িতে। প্রতিদিন বাইসাইকেল চালিয়ে ডিউটিতে আসেন তিনি। গত ৪ বছর এই বুথে তিনি এ চাকরি করছেন।

ইমদাদুল শেখ বলেন, বাধ্য হয়ে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করছি। আগে অন্য কাজ করতাম। আমার চাকরির ডিউটি ৮ ঘণ্টা, এতে মূল বেতন পাই ৬ হাজার টাকা। এই দিয়ে নিজের বা পরিবার নিয়ে চলা যায় না। তবে ৩ জনের ডিউটি দুজনে ভাগ করে করার কারণে বেতন কিছুটা বাড়ে, তবে মাসজুড়েই ডিউটি থাকে। আরেক জনের ডিউটিও করি, এতে বেতন কিছুটা বাড়ে। যেটা দিয়ে সংসারে কিছুটা সাহায্য করতে পারি। দুজনের ডিউটি করে মাত্র ৯ হাজার টাকা বেতন পাই।

1f15a5bd-ea60-40a6-9933-22c318451ba1

তিনি আরও বলেন, আমার স্ত্রী গৃহিণী, ছেলে বিয়ে দিয়েছি, সেও তার স্ত্রী সন্তান নিয়ে আমাদের সঙ্গে থাকে। ফলে দুজনের আয় দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে। তা ছাড়া তিন মেয়ের মধ্যে দুজনকে বিয়ে দিয়েছি, আরেকজন স্কুলে পড়াশোনা করে। তাদের ভালো-মন্দ খাওয়ানোর মতো পয়সা বেশির ভাগ সময় থাকে না। ঈদের ছুটিতে সকালে সবার সঙ্গে থাকতে পারলেও সকাল ৮টায় আসতে হবে, আর যাব রাত ৮টায়। ঈদে পরিবার নিয়ে সময় কাটানোরও সেই সুযোগও নেই।


বিজ্ঞাপন


ইমদাদুল বলেন, পৃথিবীতে আমাদের মতো অসহায় আর কেউ নেই। যারা সারাদিন চাকরির কাজ করেও নিজের সংসার চালাতে পারেন না। কীভাবে যে একেকটা দিন কাটে সেটা বলে বোনানো সম্ভব নয়। ঈদের দিনে যদি ছুটি থাকত তাহলে সবার সঙ্গে থাকতে পারতাম তাহলে ভালো লাগত। ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই। এই সিকিউরিটি গার্ডের আবদার, দেশের সরকার যাতে আমাদের বেতন-ভাতার ব্যাপারে একটি সার্বিক সিদ্ধান্ত নেন। সব গার্ড অন্তত পরিবারের মানুষ নিয়ে ডাল-ভাত খেতে পারে এমন বেতন হলেই চলবে, আর বেশি কিছু চাই না।

একই এলাকার একটি অন্য একটি এটিএম বুথে চাকরি করেন আব্দুর রব (৪৫), তার বাড়ি একই উপজেলার লক্ষীপাশা ইউনিয়নের নোয়াপাড়া গ্রামে, যা তার কর্মরত স্থান থেকে প্রায় সাড়ে ৭ কিলোমিটার দূরে, তিনিও বাইসাইকেল চালিয়ে ডিউটিতে আসেন। গত ৩ বছর ধরে বিভিন্ন ব্যাংকের সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, এবার ঈদের দিনও ডিউটি আছেরে ভাই, আমাগের আর কোনো ছুটি নেই।

06718af9-2afe-4b4d-b796-08d8089fb000

তিনি বলেন, ছোট বেলায় লেখাপড়া কিছু করিনি, তাই ভালো কিছু জানাশোনাও নেই। গ্রামে কৃষি কাজ করে সংসার চালাতাম, তবে নিজের জমি বেশি না থাকায় ও সেসব কাজ আর করতে পারি না৷ ২০২৩ সালে এসে একই অফিসে প্রথমে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি শুরু করি। সেখানে তিন বছর থাকার পর এটিএম বুথের গার্ড হিসেবে জয়েন করি। আমরা আমাদের কাজের ঠিকমতো বেতন পাই না। আমরা কাজ অনুসারে অন্তত বেতন পেলে পরিবারের জন্য ভালো হয়।

তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন ব্যাংকে এর আগে চাকরি করেছি, পরে এই এটিএম বুথে জয়েন করি। আগের অফিসের চেয়ে এটিএম বুথে বেতন কম হলেও এখানেই ভালো। শরীরের ওপর কোনো চাপ থাকে না। তবে এখানের বেতন দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। বাড়িতে স্ত্রী ও ৪ ছেলে মেয়ে। বড় মেয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। এক ছেলে মাদরাসায় পড়ে। সবার খরচ চালাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। আমরা যে পরিমাণ সময় ডিউটিতে থাকি, সেসময়ের ন্যায্য বেতন পেলেই খুশি।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর