ঈদের ছুটি শুরু হয়েছে। চারদিকে উৎসবের আমেজ। কিন্তু খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডে রোগীদের ফাইলে গভীর মনোযোগ দিয়ে চোখ বুলাচ্ছেন একজন সিনিয়র নার্স। কোন রোগীকে কখন কোন ওষুধ দিতে হবে, তা নিরূপণ করছেন তিনি। খুলনা শহর থেকে প্রায় একশো কিলোমিটার দূরে গ্রামের বাড়ি তার।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘এবারও শহরেই ঈদ করতে হবে, হাসপাতালে ডিউটি রয়েছে। মনের ভেতর আপনজনদের জন্য অতৃপ্তি থাকলেও, আমার মতো শত শত মানুষ তো হাসপাতালের বিছানায় ঈদ কাটাবেন। তাদের সেবার মধ্য দিয়েই এবার ঈদের আনন্দটুকু খুঁজে নেব।’
বিজ্ঞাপন
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের একটি থানায় কর্মরত কনস্টেবল তাজ। এবার ঈদে তিনিও বাবা-মায়ের সঙ্গে উৎসব উদযাপনের সুযোগ পাচ্ছেন না। নগরীর ব্যস্ততম শিববাড়ী মোড়ে দাঁড়িয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের পেশাটাই এমন যে ঈদসহ যেকোনো বড় উৎসবের সময় দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। সাধারণ মানুষের ছুটির দিনে আমাদের তৎপর থাকতে হয় বেশি।’
তার গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে। সেখানে তার বয়োবৃদ্ধ বাবা-মা থাকেন। কিন্তু পেশাগত দায়িত্বের কারণে এবার বাড়ি যাওয়া হচ্ছে না তার।
সেখানে দায়িত্বরত অন্য এক পুলিশ সদস্য জানান, ঈদের সময় ঘরমুখো মানুষের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ে। তাই ছুটির দিনেও নিরবচ্ছিন্ন দায়িত্ব পালন করতে হয়। তিনি হাসিমুখে বলেন, ‘মানুষ নিরাপদে ঈদ উদযাপন করে বাড়ি ফিরুক, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ।’

দূরপাল্লার বাসচালক রমজান আলী জানালেন, বছরের অন্য সময়ের তুলনায় ঈদের মৌসুমে ট্রিপ বেশি থাকে। তার ভাষায়, ‘দূর-দূরান্ত থেকে পরিবারের কাছে ঈদ করতে যাওয়া মানুষগুলোকে নিরাপদে স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মধ্যেই আমি ঈদের আসল আনন্দ পাই।’
তিনি আরও জানান, ঈদের দিন সকালেও তার ডিউটি থাকে। রাস্তার পাশে কোনো মসজিদে ঈদের নামাজ পড়ে নিয়েই আবার গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত দিতে হয়।
স্থানীয় এক বিদ্যুৎকর্মী বলেন, ঈদের সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে দ্রুত সমাধান দিতে হয়। কারণ উৎসবের এই দিনগুলোয় বিদ্যুতের চাহিদা তুলনামূলক বেশি থাকে।
অন্যদিকে, সংবাদকর্মীরাও ঈদের আনন্দ আর দশজনের মতো উপভোগ করতে পারেন না। বিশেষ করে টেলিভিশন ও অনলাইন গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিকেরা ঈদের দিনও সড়কের পরিস্থিতি ও জনভোগান্তির চিত্র তুলে ধরতে মাঠে নিরলস কাজ করেন।
ঈদে সবার ছুটি থাকলেও বিভিন্ন আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক ভবন এবং অফিস-আদালতে কর্মরত নিরাপত্তা প্রহরীদের ছুটি মেলে না। নিরাপত্তা প্রহরী গাউসুল আলম বলেন, ‘ঈদের সময় সবাই গ্রামে চলে যায়। এ সময় তাদের ফাঁকা বাসা-বাড়ির নিরাপত্তার দায়িত্ব আমাদের ওপর থাকে। ইচ্ছা থাকলেও বাড়ি যেতে পারি না। পরিবারের জন্য মন খারাপ তো লাগেই।’
এছাড়া গ্যাস ও পানি সরবরাহ সংস্থার কর্মীরাও উৎসবের দিনগুলোয় সার্বক্ষণিক তৎপর থাকেন। শহরের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ঈদের দিন সকাল থেকেই রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখার কাজে নিয়োজিত থাকেন, যাতে নগরবাসী পরিচ্ছন্ন পরিবেশে ঈদ উদযাপন করতে পারেন। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরাও যেকোনো অগ্নিকাণ্ড বা দুর্ঘটনার মোকাবিলায় স্টেশনগুলোয় সদা প্রস্তুত থাকেন।

নিজেদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আনন্দকে বিসর্জন দিয়ে জরুরি সেবায় নিয়োজিত এসব মানুষ টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া সারাদেশের অন্য মানুষের ঈদকে আনন্দময় ও নিরাপদ করে তুলছেন। তাদের এই আত্মত্যাগ ও অবদান অনেক সময় প্রচারের আড়ালে থেকে যায়; কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সম্মুখসারির যোদ্ধাদের ছাড়া আমাদের ঈদের স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা কল্পনাও করা যায় না।
প্রতিনিধি/একেবি




