ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লিচু চাষিদের মুখে এবার তৃপ্তির হাসি। কারণ হয়েছে বাম্পার ফলন। আবহাওয়া ভালো থাকায় এবং ঝড়-বৃষ্টি কম হওয়ায় ভালো ফলন হয়েছে বলে জানিয়েছেন চাষিরা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৫৫৫ হেক্টর জমিতে লিচু উৎপাদিত হয়েছে। যার বাজার মূল্য আনুমানিক ২৯ কোটি টাকা। তারা জানান, লিচুর উৎপাদন এ বছর লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা কসবা, আখাউড়া ও বিজয়নগর উপজেলার পাহাড়ি জমিতে লিচুর চাষ করা হয়। আখাউড়া উপজেলার ধলেশ্বর, রাজাপুর, আমোদাবাদ, মোগড়া ও মনিয়ন্দ এলাকা এবং কসবা উপজেলার গোপীনাথপুর ও বায়েক ইউনিয়নে রয়েছে কয়েকশত লিচুর বাগান। তবে সবচেয়ে বেশি লিচুর বাগান বিজয়নগর উপজেলায়। বিজয়নগর উপজেলার লিচু মিষ্টি ও রসালো হওয়ায় দেশজুড়ে রয়েছে এর খ্যাতি। বিজয়নগর উপজেলার পাহাড়পুর, বিষ্ণুপুর, কাঞ্চনপুর, খাটিঙ্গা, কাশিমপুর, সিঙ্গারবিল, চম্পকনগর, কালাছড়া, মেরাশানী, কামাল মোড়া, নূরপুর, হরষপুর, ধোরানাল, মুকুন্দপুর, সেজামুড়া, নোয়াগাঁও, অলিপুর, চান্দপুর, মেরাশানী, কাশিনগর, চতুরপুর, রূপা, শান্তামোড়া, কামালপুর, কচুয়ামোড়া, ভিটি দাউদপুর এলাকায় রয়েছে প্রায় পাঁচ শতাধিক লিচুর বাগান। লিচুর ব্যবসা লাভজনক হওয়ায় ওইসব এলাকার লিচু চাষিরা ধানী জমিতেও লিচুর চাষ করছেন।
বিজ্ঞাপন

দেশের অন্যান্য জায়গায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে লিচু বাজারে আসলেও বিজয়নগর উপজেলার লিচু মে মাসের প্রথম দিকে বাজারে আসে। বিজয়নগর উপজেলার সবচেয়ে বড় লিচুর বাজার হচ্ছে আউলিয়া বাজার ও মেরাশানী। এছাড়াও উপজেলার মুকুন্দপুর, কাংকইরা বাজার, চম্পকনগর, সিঙ্গারবিল বাজার, আমতলী বাজারসহ আরো কয়েকটি বাজারে পাইকারিভাবে লিচু বেচা-কেনা হয়। এসব বাজার থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, নরসিংদী, ভৈরব, নোয়াখালী, চাঁদপুর, মৌলভীবাজার, সিলেট, শ্রীমঙ্গল, হবিগঞ্জ, ফেনী ও রাজধানী ঢাকার ব্যবসায়ীরা লিচু কিনে ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে নিয়ে যায়। এলাকাবাসী ও চাষিরা জানায়, উপজেলার সবচেয়ে বড় লিচু বাজার পাহাড়পুর ইউনিয়নের আউলিয়া বাজার। সেখানে প্রতিদিন প্রায় অর্ধকোটি টাকার লিচু বেচা-কেনা হয়। প্রতিদিন গভীর রাতে চাষি ও বাগানের মালিকরা তাদের উৎপাদিত লিচু বাজারে নিয়ে আসে। রাত তিনটা থেকে শুরু হয়ে সকাল আটটার মধ্যেই বেচা-কেনা শেষ হয়ে যায়।
লিচু চাষিরা জানান, বিজয়নগরে পাটনাই, বোম্বাই, চায়না থ্রি ও এলাচি জাতের লিচু চাষ করা হয়। এলাচি ও চায়না থ্রি জাতের লিচু আকারে একটু বড়। আবহাওয়া ভালো থাকায় ও সার কীটনাশকের দাম সহজলভ্য হওয়ায় এ বছর লিচুর ভালো ফলন হয়েছে। এদিকে প্রতিদিন সকাল-বিকেল জেলা শহরসহ আশপাশ এলাকা থেকে সৌন্দর্য পিয়াসুরা দল বেধে আসেন এই লিচু বাগান দেখতে। অনেকেই বাগানে ঢুকে শখ করে ছবি তোলেন। কেউ সেলফিতে ব্যস্ত, কেউবা পরিবারের ছবি তুলতে ব্যস্ত, কেউ ঘুরে ঘুরে বাগান দেখছেন। কেউ কেউ বাগান থেকে লিচু পেরে খাচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের কাজিপাড়া থেকে বাগানে ঘুরতে আসা বাতেন জানান, প্রতিবছরই ফেসবুকে লিচু বাগানে ঘুরতে আসা মানুষজনের ছবি দেখি। ব্যস্ততার কারণে আসা হয় না। এবার পরিবার পরিজন নিয়ে এসেছি। লিচু বাগান দেখে বাচ্চারা খুব খুশি হয়েছে।
বিজয়নগর উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়নের মাধবের বাগের লিচু চাষি আবু ছায়েদ জানান, পরিবেশ অনুকূলে থাকায় লিচু ভালোই হয়েছে। তার বাগানে প্রায় ৫০টি লিচু গাছ রয়েছে। প্রতিদিনই বাগানে দর্শনার্থীরা ঘুরতে আসছেন এবং তারা লিচু কিনে নিয়ে যাচ্ছে, চায়না-থ্রি একশ লিচু ১২০০ থেকে দেড় হাজার টাকা ও বোম্বে লিচু ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দরে বাগান থেকে দর্শনার্থীরা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।

উপজেলার কালাছড়া গ্রামের লিচুর চাষি শাহীন মিয়া বলেন, তার দুইটা বাগানে ৮০ -৯০টি লিচু গাছ আছে। গত ৫/৭ দিন ধরে তিনি আউলিয়া বাজারে লিচু বিক্রি করছেন। এ পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ টাকার লিচু বিক্রি করেছেন তিনি।

জেলা শহরের লিচুর পাইকার বাবু মিয়া জানান, গত ৭ দিন ধরে তিনি এই বাজারে আসছেন। প্রতিদিন গড়ে প্রায় লাখ টাকার লিচু তিনি কিনছেন। এখানকার লিচু ভালো ও মিষ্টি হওয়ায় লিচু বিক্রি করে তিনি লাভবান হচ্ছেন।

বিজয়নগর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় প্রায় পাঁচ শতাধিক লিচুর বাগান রয়েছে। এসব বাগানে দেশি লিচু, এলাচি লিচু, চায়না লিচু, পাটনাই লিচু ও বোম্বাই লিচু চাষ করা হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশিক্ষণ অফিসার মুনসী তোফায়েল হোসেন বলেন, মাটির গুণাগুণ ভালো হওয়ায় চলতি বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ৫৫৫ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ করা হয়েছে। এ বছর জেলাতে প্রায় ২৯ কোটি টাকার লিচু বিক্রি করা হবে।
প্রতিনিধি/এসএস




